ভূমিকম্প আতঙ্ক: ‘প্যানিক অ্যাটাক’ নাকি ‘সিসমোফোবিয়া’?
শুক্রবার সকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার একটি ছয়তলা ভবনের চারতলার ভাড়া বাসায় মা দীপু মন্ডলের সঙ্গে বাসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন মেয়ে শিমু। হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হলে ভয়ে মেয়েকে জাপটে ধরেন মা।
শিমু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ওই সময় মায়ের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। তৎক্ষণাৎ তাকে পানি খাওয়াই, চোখে-মুখে পানি দেই। এরপর তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হন।'
এখানেই শেষ নয়, ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের পর আতঙ্কে সেদিন রাতেও ঘুমাতে পারেননি ৫৭ বছর বয়সী দীপু। তার মনে হতে থাকে, একটু পরেই আবার বুঝি কেঁপে উঠবে সব।
ভূমিকম্পের পরপরই দীপু যে ধরনের আতঙ্কে ভুগছিলেন, সেটা 'প্যানিক অ্যাটাক' বলে জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ভূমিকম্প কিংবা যেকোনো ঘটনায় হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অসুস্থবোধ করাকে 'প্যানিক অ্যাটাক' বলে।
'প্যানিক অ্যাটাককে ভীতি বলা যাবে না, আতঙ্ক বলতে হবে। এটি হঠাৎ করে হয়। স্থায়িত্বও কম। তবে অল্প সময়েও এর মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।'
প্যানিক অ্যাটাক বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এক্ষেত্রে কারণও ভিন্ন ভিন্ন। ভূমিকম্পের কারণে যেটি হয়, সেটি 'ভূমিকম্পজনিত প্যানিক অ্যাটাক'। গত দুদিনে তিনবার ভূমিকম্প হওয়ার পর যে আতঙ্ক মানুষের মনে তৈরি হয়েছে, সেটিও প্যানিক অ্যাটাক বলেই মনে করছেন এই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।
অন্যদিকে সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প-ভীতি 'দীর্ঘস্থায়ী' হয় উল্লেখ করে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, 'একজন মানুষের সমস্ত চিন্তার জগতজুড়ে যখন ভূমিকম্প ভীতি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, সেটা হলো সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প-ভীতি। সিসমোফোবিয়ার ক্ষেত্রে মানুষ ভূমিকম্পের কারণে ভবন ধস হতে পারে ভেবে মৃত্যুভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।'
সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প-ভীতির ক্ষেত্রে তিন ধরনের লক্ষণ দেখা যায়—মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক। মানসিক লক্ষণের মধ্যে আছে—সারাক্ষণ খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা করা ও নিজেকে নিরাপদ স্থানে রাখা নিয়ে চিন্তা করা। শারীরিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—মাথা ঘুরানো, মাথাব্যথা, গলা শুকিয়ে যাওয়া, ঘুম কম হওয়া ইত্যাদি। আর সামাজিকভাবে লক্ষণের মধ্যে আছে সাধারণত উঁচু ও পুরোনো ভবন এড়িয়ে চলা।
করণীয়
ভূমিকম্পজনিত প্যানিক অ্যাটাকের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে ডা. হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এই সময় অসুস্থ বোধ করা ব্যক্তিকে ভিড় থেকে খোলামেলা জায়গায় নিতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করছে। ওই ব্যক্তির রক্ত চলাচল স্বাভাবিক আছে কি না, সেটাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কেউ জ্ঞান হারালে বা অসুস্থবোধ করলে তার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। অসুস্থতার মাত্রা বেশি হলে হাসপাতালে নিতে হবে।
সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প-ভীতির ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা চালাতে হবে। একইসঙ্গে থেরাপি, কাউন্সেলিং, ব্যায়াম, পরিবার ও সমাজের সমর্থন—এসবই চিকিৎসার প্রধান অংশ। তবে ব্যক্তিভেদে চিকিৎসার ধরন ভিন্ন হতে পারে।
ভূমিকম্পের মতো ঘটনায় এই দুটো ছাড়াও আরও কিছু অসুস্থতা দেখা দিতে পারে বলে জানান ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। যেমন: অস্থিরতা ও ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত বা দুঃস্বপ্ন এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া।
ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও সচেতনতা ও পূর্ব প্রস্তুতির মাধ্যমে ভয়-ভীতি বা আতঙ্ক কমানো যায় বলে মনে করেন এই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।


Comments