অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন-খাদ্যাভাস ও মানসিক চাপেই বাড়ছে ডায়াবেটিস
সুমন কবীর (ছদ্মনাম), রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। নগরজীবনের বহু পেশাজীবীর মতোই তার দৈনন্দিন জীবনযাপনও অনেকটা একই রকম।
অফিসে ক্যান্টিন থাকলেও দুপুরের সময় তিনি সাধারণত বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে ক্যান্টিনে খাওয়ার সুযোগ হয় না। বিকল্প হিসেবে তিনি ভরসা করেন ফাস্ট ফুডের ওপর।
অফিসে ফিরে দিনের বেশিরভাগ সময়ই সুমন কাটান কম্পিউটারের সামনে, খুব কমই বিরতি নেওয়ার সুযোগ হয়। কাজেও থাকে প্রচুর চাপ।
'একদিন আমাদের অফিসে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি পরীক্ষা করাই,' সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি। 'ফল দেখে ভীষণ অবাক হয়ে যাই—রক্তে শর্করার মাত্রা ছিল খুবই বেশি। আমার তো ধারণাই ছিল না যে ডায়াবেটিস আছে। এখন খুব সতর্কভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।'
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সুমনের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস— এসব সরাসরি ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, চাপপূর্ণ কর্মপরিবেশ ও সচেতনতার অভাবের মতো নানা কারণে সুমনের মতো হাজারো মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ৩৮ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি—যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ পালন করছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ বছর কর্মজীবী মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আইডিএফ তাদের প্রচারণার মূল বিষয় ঠিক করেছে—'ডায়াবেটিস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্কপ্লেস'।
১৯৯১ সালে আইডিএফ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস চালু করে এবং ২০০৭ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
ডায়াবেটিস রোগী বাড়ছেই
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রকাশিত এক সাময়িকীতে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের অ্যাকাডেমি পরিচালক ফারুক পাঠান লিখেছেন, দেশে বর্তমানে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কর একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।
এই হিসাব সঠিক হলে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা তিন কোটিরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
যদিও তিনি তথ্যের উৎস স্পষ্ট করেননি, তবে সমিতির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০১৮ সালে সারা দেশের এক লাখ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি চারজনের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
হাসপাতালের তথ্যও ডায়াবেটিস রোগী বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ সালে নিবন্ধিত ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ ১০ হাজার, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ বলেন, সাম্প্রতিক কোনো জাতীয় পর্যায়ের তথ্য না থাকলেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে— ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
তার মতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষই নিজের অবস্থা সম্পর্কে জানেন না— যার অর্থ প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসই দায়ী
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা ডায়াবেটিস বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
অধ্যাপক আজাদ বলেন, অফিসকর্মীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করা এবং শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ কম থাকায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শহর এলাকায় হাঁটা বা শারীরিক ব্যায়ামের মতো জায়গারও অভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, 'ব্যস্ত অভিভাবকেরা অনেক সময় বাসার খাবার না দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় সন্তানদের টাকা দিয়ে দেন। এতে তারা ফাস্ট ফুড খেতে উৎসাহিত হয়।'
তার মতে, এসবই দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
বারডেমের মহাপরিচালক অধ্যাপক মির্জা মাহবুবুল হাসান বলেন, দীর্ঘসময় বসে থাকা 'ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর', আর ডায়াবেটিস প্রতিরোধে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, জীবনযাপনের পরিবর্তন এখন অত্যাবশ্যক।
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রফেসর সাহেলা নাসরিন বলেন, হাঁটার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, 'সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট হাঁটা এবং সপ্তাহে তিন দিন হালকা ব্যায়াম ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।'
বারডেমের ডেন্টাল সার্জারি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, তামাক সেবনও ডায়াবেটিসের বড় ঝুঁকির একটি কারণ।
সমিতির মহাসচিব মো. সায়েফ উদ্দিন বলেন, ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।


Comments