২০২৫ সালের বিস্ময়কর যত আবিষ্কার
পাথরে জমে থাকা বিশাল ডাইনোসরের পায়ের ছাপ থেকে শুরু করে গ্রহগুলোর এক অভূতপূর্ব সারিবদ্ধ দৃশ্য, ২০২৫ সালে বিজ্ঞান আমাদের সত্যিকার বিস্ময়ের বহু মুহূর্ত উপহার দিয়েছে।
বিবিসি বলছে, মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে নতুন করে নজর দিয়ে আগুন ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ থেকে শুরু করে মানুষ কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলে সে বিষয়ে নতুন ধারণা পাওয়া গেছে।
প্রাকৃতিক বিশ্বও আমাদের অবাক করা থামায়নি। বন্য শিম্পাঞ্জিদের দেখা গেছে উদ্ভিদকে ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতে, আর স্বর্ণের চেয়েও দুর্লভ বিবেচিত চাঁদের ধুলো গবেষণার জন্য হাতে পেয়েছে যুক্তরাজ্য।
তবে সব খবরই সুখবর ছিল না। বিশাল এক হিমশৈল একটি প্রত্যন্ত দ্বীপের দিকে ভেসে যেতে থাকায় সেখানে বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি হয়েছে। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান যেমন আবিষ্কারের জন্য জরুরি, তেমনি বিপদের পূর্বাভাস দিতেও অপরিহার্য।
জুরাসিক যুগের বিশাল পায়ের ছাপ
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ারের একটি খনিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডাইনোসরের পদচিহ্নের স্থান আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের অন্তত ২০০টি বিশাল পায়ের ছাপ সেখানে পাওয়া গেছে।
এই পদচিহ্নগুলো দুই ধরনের ডাইনোসরের চলাচলের প্রমাণ দেয়। একটি লম্বা গলাওয়ালা সোরোপড, যা সম্ভবত সিটিওসোরাস এবং অন্যটি দুই পায়ে চলা মাংসাশী মেগালোসোরাস।
কিছু পদচিহ্নের সারি ১৫০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ। গবেষকদের ধারণা, খনির কেবল একটি অংশ খনন করা হয়েছে। ফলে এগুলো আরও বিস্তৃত হতে পারে।
মানুষের আগুন জ্বালানোর ইতিহাস
সাফোকের বার্নহ্যামে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে গবেষকরা মানুষের তৈরি আগুনের প্রাচীনতম প্রমাণ আবিষ্কার করেছেন, যার বয়স আনুমানিক ৪ লাখ বছর।
এই আবিষ্কার আগুন তৈরির ইতিহাসকে ৩ লাখ ৫০ হাজার বছরেরও বেশি পিছিয়ে দেয়, যা মানব বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগুন জ্বালানোর ক্ষমতা মানুষের দৈনন্দিন জীবন বদলে দেয়। উষ্ণতা প্রদান, খাবার রান্না ও মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে। যা প্রাচীন মানুষকে চিন্তা, পরিকল্পনা ও নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ দেয়।
শিম্পাঞ্জিদের প্রাকৃতিক চিকিৎসা জ্ঞান
উগান্ডায় বন্য শিম্পাঞ্জিদের ক্ষত ও অন্যান্য আঘাত সারাতে উদ্ভিদ ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা স্থানীয় একটি দলের সঙ্গে কাজ করে শিম্পাঞ্জিদের নিজেদের ক্ষতে এবং কখনো অন্য শিম্পাঞ্জির ক্ষতেও উদ্ভিদ প্রয়োগ করতে দেখেছেন।
দশকের পর দশক ধরে করা পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণা প্রমাণ করে, আমাদের নিকটতম আত্মীয়দের মধ্যে প্রাকৃতিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্ময়কর জ্ঞান রয়েছে।
একগামিতায় আশ্চর্যজনকভাবে এগিয়ে মানুষ
আমরা মানুষেরা নিজেদের রোমান্টিক দিক থেকে অনন্য ভাবি, কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে জুটি গঠনের আচরণ নিয়ে করা এক গবেষণা ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে।
প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ একগামী সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে, এই ক্ষেত্রে আমরা শিম্পাঞ্জি ও গরিলাদের চেয়ে এগিয়ে, তবে আজীবন জুটি গঠনের ক্ষেত্রে 'চ্যাম্পিয়ন' হিসেবে পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়ান ইঁদুরের (মিরক্যাট) চেয়ে পিছিয়ে।
গবেষণাটি দেখায়, মানুষ সবচেয়ে একগামী প্রাণী না হলেও, অন্যান্য বহু প্রজাতির তুলনায় আজীবন জুটি গঠনের প্রবণতা আমাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সাতটি গ্রহের বিরল কুচকাওয়াজ
ফেব্রুয়ারির কয়েকটি সন্ধ্যায় আকাশপ্রেমীরা এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করেন, যখন একই সময়ে সন্ধ্যার আকাশে সাতটি গ্রহ দেখা যায়।
মঙ্গল, বৃহস্পতি, ইউরেনাস, শুক্র, নেপচুন, বুধ ও শনি—সবাই এই গ্রহের কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। এর মধ্যে চারটি খালি চোখে দেখা গেলেও শনি দিগন্তের কাছে ছিল এবং ইউরেনাস ও নেপচুন দেখতে টেলিস্কোপের প্রয়োজন হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এত পরিষ্কার ও অনুকূলভাবে গ্রহগুলোর এমন উপস্থিতি ২০৪০ সালের আগে আর দেখা যাবে না।
চাঁদের পাথরের নমুনা পেল যুক্তরাজ্য
প্রায় ৫০ বছর পর প্রথমবারের মতো চাঁদের পাথরের নমুনা এসেছে যুক্তরাজ্যে, যা চীনের কাছ থেকে ধার নেওয়া হয়েছে।
চাঁদের ধুলোর ক্ষুদ্র কণাগুলো এখন মিল্টন কেইনসের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা গবেষণাগারে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন অধ্যাপক মহেশ আনন্দ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি এই নমুনায় নিয়ে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন।
বৈজ্ঞানিক মূল্যের কারণে স্বর্ণের চেয়েও বেশি মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত এসব নমুনা চাঁদের সৃষ্টি ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।


Comments