ইয়েমেন ভাঙতে এবার গণভোটের ডাক
ইয়েমেন ভেঙে যাওয়া যেন ক্রমশই বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত যে ইয়েমেন বিশ্ব মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে তা এক সময় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। ১৯৯০ সালে সেই দুই পৃথক অঞ্চল একত্রিত হয়ে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র নাম নেয়। প্রায় ৩৫ বছর পর সেই ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেনে বেজে উঠেছে ভাঙনের সুর।
গতকাল ২ জানুয়ারি আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) দেশটির দক্ষিণাঞ্চলকে আলাদা করতে গণভোটের ডাক দিয়েছে।
এই সংগঠনটির অভিযোগ—এক সময়ের মিত্র সৌদি আরব তাদের সেনাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অপরদিকে, সৌদি আরব সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের স্বাধীনতাকামীরা আশা করছে যে আগামী দুই বছরের মধ্যে তারা উত্তরাঞ্চল থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য গণভোটের আয়োজন করবে। তাদের অভিযোগ—গত মাসে এসটিসির দখল করা অঞ্চল ফিরে পেতে সৌদি-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এসটিসির ওপর হামলা চালাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গতকাল ২ জানুয়ারি সৌদি সীমান্তবর্তী ইয়েমেনের হাদরামউত প্রদেশে সৌদি-সমর্থিত সেনা ও স্বাধীনতাকামী এসটিসির সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এসটিসির অভিযোগ—সীমানার কাছে তাদের সেনাদের ওপর সৌদি আরব বোমা বর্ষণ করেছে।
সেসব হামলায় ৭ জন নিহত ও ২০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে দাবি এসটিসির আঞ্চলিক প্রধান মোহাম্মদ আবদুলমালিকের।
হাদরামউত প্রদেশের গভর্নর সালেম আল-খানবাশি এক বার্তায় বলেছেন, 'এসব অভিযানকে যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া হিসেবে দেখা যাবে না। বরং বিশৃঙ্খলা বন্ধ ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সতর্কতা হিসেবে এসব অভিযান চালানো হয়েছে।'
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা মোহাম্মদ আল আত্তাব জানান, সৌদি সীমানা বরাবর যেসব এলাকা এসটিসির সেনাদের নিয়ন্ত্রণে সেসব এলাকা ফিরে পেতে তাদের ওপর হামলার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, সৌদি আরব সবাইকে নিয়ে 'দক্ষিণের সমস্যা সমাধানের' আহ্বান জানিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
স্বাধীনতার জন্য গণভোট
আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সেখানকার সৌদি-সমর্থিত সরকার বলেছে যে, গভর্নর সালেম আল-খানবাশিকে 'জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর' পুরো দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। তাকে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরও এমন ঘোষণার পরই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এসটিসি ঘোষণা দেয় যে, তারা আগামী দুই বছর অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ করবে। এরপর তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবে।
প্রতিবেদন অনুসারে—এসটিসির প্রেসিডেন্ট আইদারোস আলজুবিদি এক টেলিভিশন ভাষণে বলেছেন, 'আমরা ঘোষণা দিচ্ছি যে, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী দুই বছর ক্ষমতায় থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাচ্ছি—তারা যেন উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করে।'
তবে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন যে, দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর যদি আবারও হামলা হয়, বা আলোচনার আয়োজন ব্যর্থ হয় তাহলে তারা 'দ্রুত' স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেবে।
তিনি আরও বলেন, 'স্বাধীনতার ঘোষণা এলে আমরা তৎক্ষণাৎ তা কার্যকর করবো।'
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি?
কাতারের রাজধানী দোহা থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা আলি হাশেম জানান, দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার ঘোষণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এমনকি, হুতি বিদ্রোহীরাও স্বাগত জানাবে না।
হুতিরা বর্তমানে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলে রেখেছে।
সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে। রিয়াদের অভিযোগ—সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসির সেনাদের অস্ত্র দিচ্ছে। ইয়েমেনে এসটিসির প্রভাব বাড়লে দেশটির ঐক্য নষ্ট হবে।
আমিরাত এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে যে, তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধ। সৌদি আরব ইয়েমেন থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণার পরপর আমিরাত সেখান থেকে সেনা ফিরিয়ে এনেছে।
প্রায় এ দশক আগে, অর্থাৎ, ২০১৪ সালে ইয়েমেনে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন গৃহযুদ্ধের রূপ নিলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সৌদি আরব মিত্রদের নিয়ে জোট করে। সেই জোটের অংশ এসটিসির সেনারা দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা দাবি ক্রমশ জোরালো করতে থাকে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন দেখা দেয়।
শেষমেশ, সেই ভাঙন এখন ইয়েমেনকে ভেঙে ফেলার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তবে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বলছে—ইয়েমেন ভেঙে গেলে তা নতুন করে সংঘাতের জন্ম দেবে।


Comments