ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ‘দখল’ কি নতুন সংঘাতের গ্রিন সিগন্যাল?
অনেকের ধারণা—যুক্তরাষ্ট্র যা চায় তাই করতে পারে। তাদের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ করে, ইরাক ও আফগানিস্তানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার পর বিশ্ববাসীর মনে দেশটি সম্পর্কে নতুন ভয় জন্ম নিয়েছে।
ইতিহাস বলছে—২০১৭ সালে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে তার আগ্রহ আছে।
এ প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করার সময় ট্রাম্প বলেছেন, সেই অঞ্চল 'কৌশলগতভাবে' আকর্ষণীয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডেনমার্ক ও এর স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড আবারও জোর দিয়ে বলেছে যে তাদের 'ভূমি বিক্রির জন্য নয়'।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আবারও সামনে আনেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের পাঠকরা জানেন যে, কিভাবে তৎকালীন ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে ভূমি কিনে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা অঞ্চল কিনেছিল।
প্রায় ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটারের এই আলাস্কা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও জনবিরল অঙ্গরাজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র এবার ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনতে চায়। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের খ্যাতি আছে। প্রায় ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপাঞ্চলটি আয়তনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের তিন গুণের বেশি বড়।
মেক্সিকো উপসাগরের (বর্তমান নাম গালফ অব আমেরিকা) তীরবর্তী টেক্সাসের আয়তন ৬ লাখ ৯৫ হাজার ৬৬২ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড বাংলাদেশের প্রায় ১৫ গুণ বড়।
'গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাই-ই'
'গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাই-ই'—এমন মন্তব্য করে এই ইস্যুটিকে আবার চাঙা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর ২২ ডিসেম্বর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোয় সাংবাদিকদের তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড কতটা 'অত্যাবশ্যক' তা তুলে ধরতেই তিনি এমন মন্তব্য করেন।
সেই বছর ২৩ ডিসেম্বর আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—'ওটা আমাদের চাই-ই': গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নতুন করে উসকে দিলেন ট্রাম্প। ডেনমার্কে প্রতিবাদ'।
এতে বলা হয়, 'খনিজের জন্য নয়, আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড দরকার।' তিনি আরও বলেন, 'গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকালে দেখবেন এর উপকূলজুড়ে রাশিয়া ও চীনের জাহাজগুলো ঘোরাফেরা করছে। তাই ওটা আমাদের চাই-ই চাই।'
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়—প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডের খনিজসম্পদের ওপর গুরুত্ব দিতে দেখা গেলেও দ্বিতীয় মেয়াদে দেখা গেল তিনি নিজ দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছেন।
গত বছর জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তার বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে।
একই বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার ৫ দিন পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'মনে হয়, আমরা ওটা পেতে যাচ্ছি।'
আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, দ্বীপটির ৫৭ হাজার বাসিন্দা 'আমাদের সঙ্গে থাকতে চায়।' যদিও বাস্তবতা ভিন্ন।
বছর না ঘুরতেই অর্থাৎ, গত ২২ ডিসেম্বর নিজের ট্রুথ সোশ্যাল সমাজমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প জানান, লুসিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে তিনি গ্রিনল্যান্ডর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
সেই পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, 'জেফ বুঝতে পেরেছেন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড কতটা জরুরি।' এরপর রাষ্ট্রপতি আশা করেন যে, তার বিশেষ দূত নিজ দেশের, মিত্রদের ও এমনকি সারাবিশ্বের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কথা সবার সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।
এমন নিয়োগ পেয়ে ল্যান্ড্রি সমাজমাধ্যম এক্স-এ লিখেন, 'এটা অনেক সম্মানের।' তিনি জানান, গভর্নরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কাজ তিনি করে যাবেন। এ নিয়ে সমাজমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তার আশা, এ কাজে তিনি সফল হবেন।
শুধু তাই নয়, ল্যান্ড্রি আরও বলেন, 'ওটাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করবোই।'
এমন ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্র গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। তাদের আশা, এমন সংকটে ইউরোপ তাদের পাশে থাকবে।
ইতোমধ্যে, ডেনমার্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এর নিন্দা জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ট্রাম্প মনে করেন যে গ্রিনল্যান্ডের দাম সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, ১৯১৭ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ২৫ মিলিয়ন ডলারের (বর্তমানে ৬৫৭ মিলিয়ন ডলার) বিনিময়ে ভার্জিন আইল্যান্ডস কিনেছিল। মধ্য আমেরিকার ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই ১ হাজার ৯১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষার কথা বলে কেনা হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিরক্ষার কারণে কেনা ভূমির দাম আয়তনের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর।
কী চায় গ্রিনল্যান্ডবাসী?
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিএনএন এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—ট্রাম্প এমন একজনকে দূত নিয়োগ করেছেন যিনি চান গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হবে। আর এ ঘটনায় ডেনমার্ক 'ভীষণ বিরক্ত'।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'বিশেষ দূত নিয়োগের ঘটনায় ভীষণ বিরক্ত। সেই দূতের বক্তব্যও আমাকে বিরক্ত করেছে। তিনি যা বলেছেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মার্কিন বিশেষ দূতের বক্তব্যে যৌথ বিবৃতি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মিতে ফ্রেদারিকসেন ও গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেদেরিক নিয়েলসেন।
তাদের ভাষ্য: 'গ্রিনল্যান্ডের মালিক গ্রিনল্যান্ডবাসীরাই। কেউ চাইলেই একটি দেশ দখল করতে পারে না। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার যুক্তি দিয়েও তা করা যায় না। গ্রিনল্যান্ড দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না।'
গ্রিনল্যান্ডবাসীর বক্তব্য: 'বিষয়টি খুবই উদ্বেগের'।
গত বছর ২৩ ডিসেম্বর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইইউ কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন দার লেয়েন এক এক্স বার্তায় বলেন,' ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ও ডেনমার্কের সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছে।'
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পৃথক বার্তায় বলেন, 'আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবো। তিনি আরও বলেন, 'পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমাদের চিরদিনের বন্ধু আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।'
গত বছর ২৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানায়—নতুন জরিপে দেখা গেছে গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।
গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি গ্রিনল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী বিরজার পোপেল আল জাজিরাকে বলেছিলেন, 'গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বললে, দ্বীপটির ৫৫ শতাংশ মানুষ ডেনমার্কের নাগরিকত্ব ও ৮ শতাংশ মানুষ মার্কিন নাগরিকত্বের পক্ষে মত দেবেন।'
তিনি জানান যে, দেশটির পার্লামেন্টের পাঁচটির মধ্যে চারটি দলই গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা চায়। অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রেখে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে পুরোপুরি স্বাধীন হতে চায়।
তাই গত বছর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও তার স্ত্রী ঊষা ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ড সফরে এলে হাজারো মানুষ স্লোগান তুলেছিল, 'ইয়াঙ্কি গো হোম'।
মহাদেশীয় সংঘাত?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেন তা সাধারণত তিনি করে থাকেন। তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলছেন। শুধু তাই নয়, যে কোনভাবে তিনি গ্রিনল্যান্ড হস্তগত করার হুমকি দিচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোটের সদস্য হিসেবে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়াও, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটি আছে।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কথা বলছে তা গ্রিনল্যান্ড দখল না করেও দেওয়া যায়। গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা বা সামর্থ্য বাড়ানোর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পুরো আর্টিক অঞ্চলে নজরদারি বাড়াতে পারে।
একটি শক্তিশালী দেশ যখন সামরিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশের ভূমি দখলের হুমকি দেয় তখন বিষয়টি আতঙ্কের। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। এমনকি, এটি দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপ ও বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী 'মহাদেশীয় সংঘাতের' জন্ম দিতে পারে, বলেও আশঙ্কা অনেকের।
ইউরোপের নেতাদের বক্তব্য—একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানাকে আন্তর্জাতিক আইন দিয়ে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাই কেউ চাইলেই আরেক দেশের ভূমি নিজের দেশের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারে না।
আর গ্রিনল্যান্ড কোন দেশের অংশ হবে এই সিদ্ধান্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ঠিক হয়ে গেছে। এখন নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তাই গ্রিনল্যান্ড দখল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছেন তারা।


Comments