অভিবাসী নির্বাসনে ট্রাম্পের হাতিয়ার আইসিই, এর কাজ কী?
যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ৩৭ বছর বয়সী রেনে নিকোল গুডকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দেশটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থার কর্মকাণ্ড ঘিরে তীব্র বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ইতোমধ্যে মিনিয়াপোলিসসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ।
বিবিসি বলছে, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে আইসিই, যার বেশিরভাগই প্রকাশ্যে।
এসব অভিযানের ফলে দেশজুড়ে বিভিন্ন কমিউনিটিতে আইসিই এজেন্টদের উপস্থিতি বাড়লেও তাদের কার্যক্রমের বিরোধিতাকারী স্থানীয় বাসিন্দারাও রুখে দাঁড়াচ্ছেন।
আইসিই কী, কবে গঠিত হয়
ট্রাম্প প্রশাসনের গণ-নির্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে রয়েছে আইসিই। এটি ছিল ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি।
হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর আইসিই-এর আকার, বাজেট ও দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন–সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনা করে। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের অপসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় ২০০২ সালে প্রণীত হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় আইসিই গঠিত হয়। এই আইনের মাধ্যমে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অধীনস্থ একটি সংস্থা হলো আইসিই।
গ্রেপ্তারের ক্ষমতা
আইসিই তাদের দায়িত্বকে জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা—উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত বলে মনে করে। তবে তাদের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ স্থানীয় পুলিশ বিভাগের মতো নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান করছে বলে সন্দেহ হলে তাদের থামানো, আটক ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা আইসিই এজেন্টদের রয়েছে। কিছু সীমিত পরিস্থিতিতে তারা মার্কিন নাগরিকদেরও আটক করতে পারে—যেমন কেউ গ্রেপ্তারে বাধা দিলে, কোনো কর্মকর্তার ওপর হামলা করলে অথবা আইসিই যদি কাউকে অবৈধ অভিবাসী বলে সন্দেহ করে।
তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির প্রথম নয় মাসে অন্তত ১৭০টির বেশি ঘটনায় ফেডারেল এজেন্টরা মার্কিন নাগরিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখেছিল বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম প্রোপাবলিকা।
এই ঘটনাগুলোর মধ্যে এমন মার্কিনীরাও ছিলেন, যাদের অনথিভুক্ত অভিবাসী বলে সন্দেহ করা হয়েছিল।
বলপ্রয়োগের ক্ষমতা
আইসিই-এর বলপ্রয়োগের নিয়মকানুন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, দেশটির আইন এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নিজস্ব নীতিমালার সমন্বয়ে নির্ধারিত।
ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি ল'স্কুলের ক্রিমিনাল জাস্টিস প্রোগ্রামের পরিচালক ক্রিস স্লোবোগিন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী 'শুধু তখনই প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করতে পারে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের বা অন্যদের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায় অথবা কোনো সহিংস অপরাধ করে।'
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিকভাবে ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তুলনামূলক ছাড় দিয়ে এসেছে, যেখানে পরে বসে বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে না।
২০২৩ সালের ডিএইচএসের এক নীতিগত স্মারকে বলা হয়, ফেডারেল কর্মকর্তারা 'শুধু প্রয়োজন হলে' প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করতে পারেন—যখন তাদের 'যুক্তিসংগত বিশ্বাস' থাকে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের বা অন্যের জন্য আসন্ন মৃত্যু বা গুরুতর শারীরিক আঘাতের হুমকি সৃষ্টি করছেন।
আইসিই কাজ করে কোথায়
আইসিই সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই কার্যক্রম চালায়, যদিও বিদেশে তাদের কিছু কর্মী রয়েছে। তাদের সহযোগী সংস্থা ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয়।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা সংস্থা থেকে এজেন্ট এনে অভিবাসন ব্যবস্থায় যুক্ত করায় এই দায়িত্বগুলোর সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। বর্ডার পেট্রোল কর্মকর্তারাও এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আইসিইর সঙ্গে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো এবং বর্তমানে মিনিয়াপোলিসের মতো শহরে অন্যান্য ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে আইসিই ও অন্যান্য সংস্থা শত শত কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে।
এপির খবরে বলা হয়েছে, সর্বশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে মিনিয়াপোলিসে প্রায় ২ হাজার ফেডারেল কর্মকর্তা মোতায়েন করা হতে পারে।
আইসিই আটক করলে কী হয়
ট্রাম্প আমলে নির্বাসনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
প্রশাসনের দাবি, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ৬ লাখ ৫ হাজার মানুষকে নির্বাসিত করেছে। এ ছাড়া, গ্রেপ্তার বা আটক এড়াতে দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়ে চালানো জোরালো প্রচারণার পর ১৯ লাখ অভিবাসী 'স্বেচ্ছায় আত্মনির্বাসন' বেছে নিয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
কোনো অভিবাসীর সঙ্গে আইসিইর মুখোমুখি হলে বিভিন্ন ধরনের পরিণতি হতে পারে।
কখনো কাউকে সাময়িকভাবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার অন্য ক্ষেত্রে আইসিই তাকে আটক করে বড় কোনো ডিটেনশন সেন্টারে পাঠায়—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যার সংখ্যা বেশ কয়েকটি।
অনেক অভিবাসী আটক অবস্থায়ও বৈধ মর্যাদার জন্য লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত তাদের নির্বাসিত করা হতে পারে।
সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিংহাউসের ইমিগ্রেশন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ আইসিইর হেফাজতে ছিলেন।
অভিবাসন আইনজীবীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, আইসিই কাউকে আটক করার পর তার অবস্থান জানতে পরিবার বা আইনজীবীদের কখনো কখনো কয়েক দিন লেগে যায়।
আইসিইর কর্মকাণ্ড নিয়ে বির্তক
আইসিই ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো, যেমন বর্ডার পেট্রোল যখন অভিযান চালায়, তখন অনেক কমিউনিটিই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এখন আইসিই গ্রেপ্তার চালানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিডিও ধারণ করা খুবই সাধারণ ঘটনা। আইসিই ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু মুখোমুখি পরিস্থিতি আক্রমণাত্মক বা সহিংস রূপও নিয়েছে।
ইলিনয়ের শিকাগোতে আইসিই-এর অভিযানের সময় একদল গণমাধ্যম বর্ডার পেট্রোলের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা ও বিক্ষোভকারীদের ওপর এজেন্টরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। এক ফেডারেল বিচারক প্রথমে তাদের পক্ষে রায় দিলেও পরে আপিল আদালত সেই রায় বাতিল করে দেন।
মিনিয়াপোলিসের গুলির ঘটনা অভিবাসন প্রয়োগ অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে আহত হওয়ার প্রথম ঘটনা নয়।
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে লস অ্যাঞ্জেলেসে দুটি ঘটনায় এজেন্টরা চালকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ডিএইচএসের দাবি, উভয় ক্ষেত্রেই চালকেরা কর্মকর্তাদের ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
অভিযানের সময় মুখোশ পরা নিয়েও আইসিই ও অন্যান্য অভিবাসন কর্মকর্তারা সমালোচিত হয়েছেন। ডিএইচএস কর্মকর্তারা এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন যে, এতে এজেন্টরা হয়রানি থেকে সুরক্ষিত থাকেন।
আইসিই ও নির্বাসন নিয়ে মার্কিনিদের অবস্থান
জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিবাসন প্রয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি জটিল।
২০২৫ সালের অক্টোবরে নিরপেক্ষ পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, অর্ধেকের একটু বেশি মানুষ মনে করেন, কোনো না কোনো মাত্রার নির্বাসন প্রয়োজন। মার্চ মাসের জরিপেও প্রায় একই ফল পাওয়া গিয়েছিল।
তবে একই জরিপে দেখা যায়, ট্রাম্পের নির্বাসন পদ্ধতি নিয়ে অনেক মার্কিনির উদ্বেগ রয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনিদের ৫৩ শতাংশ মনে করেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নির্বাসনে ট্রাম্প প্রশাসন 'অতিরিক্ত কড়াকড়ি' আরোপ করছে। তবে প্রায় ৩৬ শতাংশ এর পক্ষে মত দিয়েছেন।

Comments