লাউয়ের এই পুষ্টিগুণগুলো জানেন কি?
লাউ বাংলাদেশের অন্যতম একটি জনপ্রিয় সবজি। বাংলাদেশের প্রতিটি রান্নাঘরেই এই সবজিটির উপস্থিতি দেখা যায়। এটি একটি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর সবজি। শিশু থেকে শুরু বয়স্ক পর্যন্ত সবারই সবজি খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখা গেলেও লাউ প্রায় সবাই পছন্দ করে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের চাহিদা মেটাতে সবজি খাওয়া একান্ত প্রয়োজন।
চলুন জেনে নেই লাউ খেলে কোন কোন পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ হবে। এ বিষয়ে জানিয়েছেন দিয়েছেন মিরপুর জেনারেল হাসপাতালের পুষ্টিবিদ তারানা জান্নাত মুমু।
তিনি বলেন, লাউ খুবই উপকারী একটি সবজি। গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখতে ও হজম ভালো রাখতে লাউয়ের বিকল্প নেই। তবে লাউ শুধু খাদ্য নয়, এটি এক প্রাকৃতিক ওষুধও বটে। এতে আছে প্রচুর পানি, খনিজ ও ভিটামিন, যা শরীরের নানান রোগপ্রতিরোধে সহায়তা করে। এটি শরীর ঠান্ডা রাখে, হজমে সহায়তা করে, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে, ত্বক ও চুলের যত্ন নেয় এবং হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
লাউয়ের পুষ্টিগুণ
লাউ মূলত পানিযুক্ত সবজি। এর প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশই পানি। তবুও এতে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের পরিমাণও যথেষ্ট। প্রতি ১০০ গ্রাম লাউয়ে গড়ে পাওয়া যায়:
ক্যালরি: ১৪ কিলোক্যালরি
পানি: ৯৬ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ৩.৩ গ্রাম
প্রোটিন: ০.৬ গ্রাম
চর্বি: ০.১ গ্রাম
আঁশ: ০.৫ গ্রাম
ক্যালসিয়াম: ২৬ মিলিগ্রাম
লোহা (আয়রন): ০.২ মিলিগ্রাম
ভিটামিন সি: ১০ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স: সামান্য পরিমাণ
পটাশিয়াম: ১৭০ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক ও ফসফরাস: অল্প পরিমাণে উপস্থিত
এ ছাড়াও এতে আছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এই উপাদানগুলোর পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, লাউ একটি কম ক্যালরিযুক্ত, সহজ পাচ্য ও হালকা সবজি, যা সব বয়সের মানুষের জন্য উপকারী।
লাউয়ের উপকারিতা
১. উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে উপকারী
লাউয়ের পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরের সোডিয়ামের প্রভাব কমায়। এর ফলে রক্তচাপ স্থিতিশীল থাকে। এ ছাড়া লাউয়ে থাকা ফাইবার ও কম ফ্যাট হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। নিয়মিত লাউ খেলে কোলেস্টেরল কমে, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
২. ওজন কমাতে সাহায্য করে
লাউ একটি 'লো-ক্যালরি হাই ওয়াটার' সবজি। এতে ক্যালরির পরিমাণ খুব কম এবং ফ্যাট প্রায় নেই বললেই চলে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত কার্যকর। লাউয়ের রস সকালে খালি পেটে পান করলে হজমতন্ত্র পরিষ্কার থাকে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে আসে, ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ কমে যায়।
৩. হজমে সহায়ক ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে কার্যকর
লাউয়ের আঁশ হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখে এবং মলত্যাগে সহায়তা করে। এটি পেটের গ্যাস, অম্বল ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। হালকা সেদ্ধ বা সেদ্ধ লাউ বিশেষভাবে পাচ্য এবং রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্যও নিরাপদ।
৪. মানসিক প্রশান্তি ও ঘুমে সহায়ক
লাউয়ের রস মস্তিষ্কে প্রশান্তি আনে। এটি উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে।
৫. ত্বক ও চুলের যত্নে লাউ
লাউয়ে থাকা ভিটামিন 'সি' ও জিঙ্ক ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং চুলের গোঁড়া মজবুত করে। নিয়মিত লাউ খেলে ত্বক উজ্জ্বল থাকে, চুল পড়া কমে এবং ফুসকুড়ি বা ব্রণের সমস্যা কমে। লাউয়ের রস ত্বকে লাগালেও তা প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে।
৬. মূত্রবর্ধক ও কিডনি রক্ষাকারী
লাউ প্রাকৃতিক ডাই ইউরেটিক হিসেবে কাজ করে। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত জল ও বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। ফলে কিডনি সুস্থ থাকে এবং ইউরিনারি ইনফেকশন বা পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে। লাউয়ের রস হালকা লবণ মিশিয়ে খেলে প্রস্রাবের সমস্যা দূর হয়।
৭. লিভার ও গলব্লাডার সুস্থ রাখে
লাউ লিভারের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি টক্সিন দূর করে এবং লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। ফ্যাটি লিভার, জন্ডিস বা গলব্লাডারে পিত্ত জমার সমস্যায় লাউ উপকারী ভূমিকা রাখে। এটি হজম এনজাইম নিঃসরণে সহায়তা করে এবং পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে।
৮. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী
লাউয়ের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুবই কম। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা লাউয়ের তরকারি বা স্যুপ নিয়মিত খেতে পারেন। এতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৯. শরীর ঠান্ডা রাখে ও হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ করে
লাউয়ে প্রচুর পানি থাকায় এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গরমকালে লাউ খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে এবং হিটস্ট্রোক, অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি ইত্যাদি সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে। আয়ুর্বেদ মতে, লাউ শরীরের 'পিত্তদোষ' কমিয়ে শরীরকে শীতল রাখে।
১০. অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের জন্য উপকারী
লাউয়ে প্রচুর পানি, ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও ফোলেট থাকে—যা অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, রক্তাল্পতা কমায় এবং দুধের পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করে।
১১. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
লাউয়ের ভিটামিন 'সি', জিঙ্ক ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখে। নিয়মিত লাউ খেলে সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা ও ত্বকের প্রদাহ কমে।
খাবারে লাউয়ের ব্যবহার
বাংলাদেশে লাউ নানা রূপে খাওয়া হয়: লাউ চিংড়ি, লাউ ভর্তা, লাউ ডালনা, লাউয়ের স্যুপ, লাউয়ের খোসা ভাজি। মিষ্টি হিসেবে লাউয়ের হালুয়া বা পায়েস, লাউয়ের রস (স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে)। এগুলোর মধ্যে সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করা পদগুলো সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর ও হজমযোগ্য।
সতর্কতা
লাউ খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাবধানতার বিষয় মনে রাখতে হবে।
- কখনোই তিক্ত বা তেতো স্বাদের লাউ খাওয়া উচিত নয়। কারণ তেতো লাউয়ে কিউকারবিটাসিন নামক বিষাক্ত উপাদান থাকে যা বমি, ডায়রিয়া বা পেট ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
- লাউয়ের রস খাওয়ার আগে সবসময় একটু স্বাদ দেখে নিতে হবে।
- কাঁচা লাউয়ের রস বেশি পরিমাণে না খেয়ে অল্প অল্প করে পান করা উচিত।
- শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সেদ্ধ বা রান্না করা লাউ সবচেয়ে নিরাপদ


Comments