নতুন বছরে যেভাবে সাজাবেন খাদ্য তালিকা, বাদ দেবেন যা

নতুন বছরে যেভাবে সাজাবেন খাদ্য তালিকা, বাদ দেবেন যা
ছবি: সংগৃহীত

নতুন বছর মানেই নতুন সূচনা। নিজেকে নতুনভাবে দেখার, নিজের জন্য ভালো কিছু করার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা খুব আলাদা। আমাদের অনেকেরই বছর শুরু হয় একই ক্লান্তি, একই ওষুধ আর একই শারীরিক সমস্যাকে সঙ্গে নিয়ে। ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ কিংবা কিডনির জটিলতা—এসব রোগ শুধু বয়সের কারণে বা ভাগ্যের কারণে হয় না। এর বড় অংশটাই আসে আমাদের প্রতিদিনের ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং অপরিকল্পিত জীবনযাপনের কারণে।

এমএইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল বলেন, খাবার শুধু পেট ভরানোর জিনিস নয়, খাবারই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধক ওষুধ। তাই নতুন বছরে নিজের যত্ন শুরু হোক প্লেট পরিবর্তনের মাধ্যমে।

নতুন বছরে কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে এই পুষ্টিবিদ আরও জানান, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অভ্যাস করতে হলে কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত এবং কেমন খাবার পরিহার করা উচিত সেটা জানতে হবে।

খাদ্যতালিকায় যা রাখবেন

১. শাকসবজি ও ফাইবার

প্রতিদিন আমাদের প্লেটে শাকসবজি যত বেশি, রোগের ঝুঁকি তত কম। প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী পালং কিংবা লালশাক, লাউ, ঝিঙে, করলা, শসা, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো ইত্যাদি সব ধরনের সবজি রাখুন। মৌসুমি সবজি বেশি করে খাদ্য তালিকায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। এসব সবজিতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং প্রচুর ফাইবার থাকে। ফলে রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ে, কোলেস্টেরল কমে, অন্ত্র পরিষ্কার থাকে, কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাসের সমস্যা কমে। পাশাপাশি ফাইবার শরীরে ডিটক্সের কাজও করে এবং অপ্রয়োজনীয় চর্বি ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়।

২. ভালো মানের প্রোটিন

প্রতিদিন অন্তত একটি প্রোটিন উৎস রাখুন। যেমন: ডিম, মাছ (ইলিশ, রুই, দেশি ছোট মাছ, সুরমা, স্যামন, সার্ডিন) চামড়াহীন মুরগি, ডাল, ছোলা, সয়াবিন, টফু ইত্যাদি।

প্রোটিন শরীরের কোষ গঠনকারী উপাদান। প্রোটিন ছাড়া শরীর হরমোন তৈরি করতে পারে না, পেশি দুর্বল হয়, ক্ষত সহজে সারা না। এমনকি ইমিউন সিস্টেমও দুর্বল হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, বয়স্ক ব্যক্তি, অপারেশনের পর রোগী সবার জন্যই প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে এটি গ্রহণ করতে হবে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও নারীর দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৫০–৬০ গ্রাম ও ৪৫–৫০ গ্রাম।

৩. স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (ভয়ের নয়, প্রয়োজনীয়)

আমরা অনেকেই মনে করি ফ্যাট মানেই ক্ষতি। আসলে সঠিক ফ্যাট শরীরের বন্ধু। রান্নায় ব্যবহার করার চেষ্টা করুন সরিষার তেল, অলিভ অয়েল (পরিমিত)। খাবারে অল্প করে রাখুন বাদাম, আখরোট, তিসি ও চিয়া বীজ, অল্প নারকেল। এগুলো হৃদ্‌যন্ত্র রক্ষা করে, মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

৪. অন্ত্র সুস্থ মানেই ইমিউনিটি শক্তিশালী

শরীরের ৭০ শতাংশ ইমিউন সিস্টেম থাকে আমাদের অন্ত্রে। তাই 'গাট' সুস্থ থাকা খুব জরুরি। সেজন্য খাবারে যোগ করতে পারেন টক দই, ঘরে বানানো পান্তা, খাবারের আগে অল্প পরিমাণ আপেল সিডার ভিনেগার। এগুলো ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়, হজম সহজ করে এবং পেট ফাঁপা কমায়। তবে যাদের আলসার, অ্যাসিডিটি, ডায়াবেটিস বা ওষুধ চলছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন কিছু শুরু করবেন না।

যেসব খাবার বাদ দেবেন

যদি সত্যিই সুস্থ থাকতে চান, তালিকা থেকে ধীরে ধীরে বাদ দিন

  • সফট ড্রিংক ও এনার্জি ড্রিংক
  • সাদা চিনি
  • কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি
  • সাদা পাউরুটি
  • ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড
  • চিপস, মার্জারিন
  • অতিরিক্ত সাদা ভাত

এগুলো শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগসহ অনেক ঝুঁকির পথ খুলে দেয়।

দিনের খাবার যেভাবে সাজাতে পারেন

১. সকালে গরম পানি সামান্য লেবু মিশিয়ে (অ্যাসিডিটি না থাকলে)। নাশতায় ডিম বা ডাল, ভুষিসহ আটা রুটি বা ওটস, সঙ্গে সবজি।

২. দুপুরে ১ কাপ ভাত বা ২টি রুটি, প্রচুর শাকসবজি, মাছ বা ডিম বা মুরগি বা ডাল—যেকোনো ভালো মানের একটি প্রোটিন।

৩. বিকেলে ফল বা টক দই। অতিরিক্ত নুডলস বা চিপস নয়।

৪. রাতে সম্ভব হলে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে হালকা স্যুপ, সবজি, ডিম বা মাছ, দুধ। রাতে বেশি খেলে ও রাত জেগে খেলে শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়।

শরীরের দৈনিক ক্যালরি চাহিদা অনুযায়ী এভাবে সব ধরনের খাবারই খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। খাবার তখনই স্বাস্থ্যসম্মত হবে, যখন তা সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করা হবে অতিরিক্ত নয়। প্রয়োজনে একজন পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের খাদ্য তালিকা সাজিয়ে নিতে পারেন।

নতুন বছরের স্বাস্থ্য প্রতিজ্ঞা

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান
  • সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম
  • অপ্রয়োজনীয় চিনি কমানো
  • প্রতিটি খাবারে প্রোটিন রাখা
  • খাবারে অতিরিক্ত তেল, মশলা পরিহার
  • পর্যাপ্ত ঘুম ও স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ

মনে রাখতে হবে—ওষুধ নয়, সঠিক খাবারই প্রথম প্রতিরক্ষা। খাদ্য তালিকা পরিবর্তন রাতারাতি চমক দেখায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে ওজন কমায়, শক্তি বাড়ায়, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে আনে, ত্বক–চুল ভালো করে, রোগের ঝুঁকি কমায়।

নতুন বছরকে সামনে রেখে তাই সিদ্ধান্ত নিন, প্লেট বদলান, অভ্যাস বদলান। নিজের শরীরকে সময় দিন। শরীর নিজেই সুস্থতার পথে এগোতে শুরু করবে।

Comments