যানজটের ঢাকায় গন্তব্যে পৌঁছে দেয় ‘শর্টকাট’
ঢাকার কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে বসে কি কখনো ডানে বা বামে মন দিয়ে তাকিয়ে দেখেছেন? বড় রাস্তার গা ঘেঁষে থাকা সরু গলিগুলো যেন চারপাশের ব্যস্ততা আর অরাজকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, আপন মনে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়।
গাড়ি, রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কোথাও যাওয়ার সময় জ্যাম এড়িয়ে চলার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে এই সরু গলিগুলো—মাথা গলিয়ে ঠিকই তারা আপনাকে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে, যদিও বাসের জন্য সে সুযোগ নেই। দীর্ঘ যানজট আর ট্রাফিক লাইটের লাল–সবুজ আলোয় আটকে পড়ে মূল সড়কের যানবাহনগুলো ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দেয়। এরই ফাঁকে দালানকোঠা আর দোকানপাটের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া এই গলিপথগুলো যেন এগিয়ে চলার, বলা যায়, জীবনের গতিময়তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। এখানে নেই কোনো রোড ডিভাইডার, নেই ট্রাফিক পুলিশ, নেই নিয়ম মানার কড়াকড়ি—তবু আছে চলার অবিরাম তাগিদ।
ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম যে ধৈর্যের কতটা কঠিন পরীক্ষা নেয়, তা কারো অজানা নয়। কখনো কখনো তো মনে হয়, এই পরীক্ষা আত্মাকেও ছুঁয়ে যায়। মূল সড়কগুলোতে ট্রাফিক লাইটের অবিরাম জ্বলা–নেভা আর ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারি দেখে মনে হয়—যেন সবকিছু নিয়ম মেনেই চলছে, অথচ বাস্তবে তা হতাশারই আরেক নাম। সময় যেন হঠাৎ থমকে যায়, মোড়গুলোতে যানবাহনের ভিড়ে চারপাশ স্থবির হয়ে ওঠে। আর সেই স্থবিরতার মধ্যেই আপনি আধঘণ্টা ধরে একই বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন, মনে মনে ভাবতে থাকেন—'আর মাত্র পাঁচ মিনিট' কথাটার সময়সীমা আসলে ঠিক কতটা?
এবার আসা যাক ঢাকা শহরের সেই সরু অলিগলির কথায়। মানবদেহের শিরা–উপশিরার মতো শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পথগুলোতে নেই কোনো নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা। কোনো নগর পরিকল্পনাবিদ ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলো নির্মাণ করেননি, প্রয়োজনের তাগিদেই যেন এই সরু গলিগুলো আপনা-আপনি নিজেদের পথ তৈরি করে নিয়েছে। বড় বড় দালান আর দোকানপাটের ফাঁক গলে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা এসব রাস্তায় প্রতিটি মোড়ে আসলে অনেকটা অনুমানের ওপর ভর করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়, আর প্রতিটি যানবাহন চলে ভাবনাচিন্তা ছাড়াই নিজের প্রবৃত্তির টানে। এখানে নেই ট্রাফিক পুলিশ, নেই কোনো সিগন্যাল বা নিয়মের বেড়াজাল—এই পথে সবাই ফাঁকা জায়গা খুঁজে বুদ্ধি খাটিয়ে এগিয়ে চলে। এগুলোই সেই 'চিপা গলি', যা বারবার আমাদের সময় বাঁচিয়ে উদ্ধার করে।
এই যেমন ধরুন মহাখালী থেকে ফার্মগেট যাওয়ার কথা। শাহীনবাগ আর নাখালপাড়ার মাঝ দিয়ে খুব একটা পরিচিত নয় এমন একটি রিকশার পথ আছে। এই পথে গেলে, মূল সড়ক ধরে আসা আপনার বন্ধু তখনো বিজয় সরণি পার হওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত, আর আপনি তার অনেক আগেই পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। রাস্তাটির অবস্থা বলতে গেলে—ধুলোয় ভরা, কোলাহলে মুখর আর ভীষণ রকমের সরু। তার ওপর চলমান নির্মাণকাজ যেন কখনোই শেষ হয় না। ফলে এ পথে চলতে গিয়ে গাড়িতে এমন ঝাঁকুনি লাগে যে মনে হয় শরীরের হাড়গোড়ই বুঝি স্থান বদলাতে বসেছে। তবু সত্যি বলতে কী, মূল সড়কের ট্রাফিক জ্যাম এড়িয়ে দ্রুত পৌঁছাতে চাইলে এই রাস্তাটার কোনো বিকল্প নেই।
ফার্মগেট থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই কৌশল কাজে দেয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে যখন গাড়ির ভিড়ে এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা থাকে না, তখন ইন্দিরা রোড ধরে শুক্রাবাদ পেরিয়ে কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে না পড়েই সহজে কলাবাগানে পৌঁছে যাওয়া যায়। মাঝের এই পথটা খুব একটা আরামদায়ক না হলেও, সময় বাঁচিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা ঠিকই করে।
কিন্তু ঢাকা শহরে বিনামূল্যে কিছুই মেলে না—সবকিছুরই একটা মূল্য আছে। সবসময় তা অর্থের মূল্যে হয় না, কখনো কখনো মেজাজের দামেও দর কষতে হয়। এখানে টিকে থাকতে হলে আপনাকে অবশ্যই 'চিল্লানোর' কৌশলে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। 'এখানে কে গাড়ি পার্ক করেছে?', 'সব রিকশা একদিক দিয়ে আসছে কেন?', 'এই গাড়িটা একটু সাইড করো, বাইকটা যেতে দাও!' চলতি পথে কিছু মানুষ যার যার জায়গা থেকে ট্রাফিক সামলানোর দায়িত্ব নিয়ে ফেলেন। এটা কোনো রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং দরকষাকষির মতো করেই পরিস্থিতি সামলানো হয়। কয়েকজন মানুষের সম্মিলিত আওয়াজেই কখনো কখনো যানজটের অচলাবস্থা খানিকটা হলেও স্বাভাবিক হয়ে আসে।
জিগাতলা থেকে মোহাম্মদপুর যাওয়ার পথে জ্যামের চাপে যখন সাতমসজিদ রোড অগণিত গাড়ির এক বিশাল পার্কিং লটে রূপ নেয়, তখন সরু আর অমসৃণ শের-ই-বাংলা রোডই হয়ে ওঠে ভরসা। এই পথ ধরলে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে। তবে হ্যাঁ, এই রাস্তায় চলতে গিয়ে পেট থেকে মাথার মগজ পর্যন্ত যে তীব্র ঝাঁকুনি সহ্য করতে হয়, তা না প্রত্যক্ষ করলে লিখে বোঝানো সত্যিই কঠিন।
তবে হ্যাঁ, ঢাকার এই শর্টকাট রাস্তাগুলোতেও মাঝেমধ্যে দুর্ভোগ নেমে আসে। কোনো কোনো দিন হঠাৎ করেই যেন সবার একই 'সিক্রেট রুট'-এর কথা মনে পড়ে যায়। ট্রাকচালকরা সরু গলিকে হাইওয়ে ভেবে ঢুকে পড়ে, আবার কখনো যেখানে একটিমাত্র রিকশা চলার জায়গা, সেখানে একসঙ্গে তিনটি রিকশা গাদাগাদি করে ঢুকে যায়। তখন শহরটা যেন সিদ্ধান্ত নেয়—এবার মানুষকে একটু বিনয় শেখানোর পালা। কারণ এই সরু গলির আটকে পড়া এড়ানোর জন্য অন্য কোনো শর্টকাট বা বিকল্প রাস্তা নেই। যে গলিগুলো প্রতিদিন শ্বাসরুদ্ধকর জ্যাম থেকে মুক্তির পথ দেখাত, সেগুলোই হঠাৎ রিকশা আর গাড়ির ভিড়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর গোলকধাঁধায় পরিণত হয়। এমন দিনে গুগল ম্যাপসের কাছেও নতুন কোনো পথ দেখানোর মতো আর কিছু থাকে না। ওই দিনগুলোতে ঢাকাই জিতে যায়!
তবে সত্যি বলতে কী, বেশিরভাগ দিনই ঢাকা শহরই আপনাকে জিতিয়ে দেয়!
কারণ এটাই ঢাকা শহর—যে শহর কখনো আপনাকে দিশেহারা করে দেবে, কখনো খানিকটা বেসামাল করবে, আবার অচেনা মানুষের সঙ্গে চেঁচামেচিতেও জড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু দিনশেষে এই শহরটাই আবার আপনাকে ঠিক একটি পথের দিশা দেখিয়ে দেবে—গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ছোট্ট একটা শর্টকাট।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী


Comments