জেইসি বৈঠক: বাণিজ্য ও যোগাযোগ নিয়ে ঢাকা-ইসলামাবাদের আলোচনা
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নতুন বাণিজ্য এবং জাহাজ চলাচল ও আকাশপথে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হয়েছে।
২০০৫ সালের পর প্রথমবারের মতো গতকাল সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত নবম যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন খাতে সম্ভাবনা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন অর্থ ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির জ্বালানি (পেট্রোলিয়াম বিভাগ) মন্ত্রী আলি পারভেজ মালিক।
প্রায় দুই দশক পর গত বছর হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে।
পাকিস্তানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৩৮ শতাংশই আসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই হার ক্রমশ কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৬৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে এসেছে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলারে।
বৈঠকের খসড়া কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনুরোধে পাকিস্তান বিদ্যমান শুল্ক প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশের পাট, পাটজাত ও কৃষিপণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটা-মুক্ত (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
খসড়া কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উভয়পক্ষ বাংলাদেশের ওষুধ, তামাক, বস্ত্র, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, চা, প্লাস্টিক, আনারস ও লিচুর মতো ফলমূল এবং হস্তশিল্পসহ পাকিস্তানে উচ্চ বাজার সম্ভাবনাময় অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে সম্মত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জেইসি বৈঠকে কৃষি, জ্বালানি, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা, ব্যাংকিং, পর্যটন, ক্রীড়া, বস্ত্র ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, উভয় দেশ সরাসরি জাহাজ চলাচল, আকাশপথে সেবা সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে ব্যয় কমানো ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশ হালাল খাদ্য বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এর আওতায় বিএসটিআই-সনদপ্রাপ্ত হালাল পণ্য পাকিস্তানে অতিরিক্ত পরীক্ষা ছাড়াই গ্রহণ করা হবে। একইভাবে পাকিস্তান হালাল অথরিটির (পিএইচএ) সনদপ্রাপ্ত পণ্য বাংলাদেশেও স্বীকৃতি পাবে।
তারা বস্ত্রখাতে যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও একমত হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের অনেক পোশাক কারখানা পাকিস্তান থেকে ডেনিম ও অন্যান্য কাপড় আমদানি করে। বাংলাদেশের জন্য পোশাক প্রস্তুত করা অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড প্রায়ই পাকিস্তানি কাপড় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কাপড় নিতে বলে থাকে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে এমন মনোনয়নভিত্তিক সহযোগিতা উৎসাহিত করতে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।'
যোগাযোগ জোরদারের লক্ষ্যে উভয় দেশ সরাসরি আকাশপথে সেবা চালুর পাশাপাশি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের মধ্যে নৌবাণিজ্য সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান প্রস্তাব দিয়েছে, চীনসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য করাচি পোর্ট ট্রাস্ট ব্যবহার করতে পারে বাংলাদেশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচলের সুযোগ অনুসন্ধানে উভয় দেশ একমত হয়েছে, যাতে পণ্য পরিবহন দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হয়।'
বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রকৌশল ও কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সরাসরি ফ্লাইট ও জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, 'সব বিষয়ই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে পরবর্তী আলোচনার জন্য।'
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু একটি দেশের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। 'আমরা নতুন কিছু সূচনা করেছি এবং এই প্রক্রিয়াটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এগিয়ে নিতে চাই। আমরা সার্ককেও আরও শক্তিশালী করতে চাই।'
আলি পারভেজ মালিক বলেন, বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এক বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকলেও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনি আশাবাদী। 'আমরা এমনভাবে বাণিজ্য বাড়াতে চাই, যা উভয় দেশের প্রধান শিল্পখাতে সহায়ক হবে। পাটখাত মূল চালিকাশক্তি হিসেবেই থাকবে। পাশাপাশি কৃষি, ওষুধ ও অন্যান্য খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা খুঁজছি।'
উভয় দেশ নলেজ করিডরকে স্বাগত জানিয়েছে, যার আওতায় একাডেমিক বিনিময় ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি বৃত্তির সুযোগ রয়েছে।
ইআরডির বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী জেইসি বৈঠক পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে।


Comments