শীতে বিপর্যস্ত রংপুর অঞ্চল, ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা
কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে রংপুর অঞ্চল। টানা কয়েক দিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৬ থেকে ১১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে শিশু ও বৃদ্ধরা।
বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শিশু রোগীর সংখ্যা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও শিশু ওয়ার্ডে শত শত শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত তিন দিনে রংপুর বিভাগের আট জেলায় উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে এক হাজার ২৫০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে চার হাজারের বেশি শিশু। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের চিকিৎসার জন্য ভিড় করছেন অভিভাবকেরা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই শয্যায় একাধিক শিশু রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বেশির ভাগ শিশুর বয়স এক থেকে পাঁচ বছর। শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকেরা।
রংপুর নগরের তাজহাট এলাকার বাসিন্দা সাবিনা বেগম বলেন, 'আমার এক বছরের বাচ্চাটা তিন দিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছে। রাতে ঠান্ডা বেশি হলে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে না। হাসপাতালে এনে ভর্তি করাতে হয়েছে।'
'চোখের সামনে অন্য শিশুর মৃত্যুতে প্রাণটা ভয়ার্ত হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার চিত্র দেখে খুব কষ্ট লাগছে,' তিনি বলেন।
একই কথা জানান রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রাম থেকে আসা আকলিমা বেগম। তার তিন বছরের শিশু আকাশ ইসলামকে ভর্তি করেছেন হাসপাতালে। এখনো সুস্থ হয়নি।
তিনি বলেন, 'সোমবার বিকেলেও আমাদের সন্তান বাড়ির উঠানে খেলছিল। রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখান থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনতে হয়েছে। শরীরে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট আছে।'
লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে শিশু রোগ চিকিৎসক তপন চন্দ্র রায় জানান, দরিদ্র ও ভাসমান পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র, উষ্ণ খাবার ও বাসস্থানের অভাবে এসব পরিবারের শিশুরা সহজেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চরাঞ্চল ও নদীভাঙন কবলিত এলাকার শিশুদের অবস্থা আরও নাজুক।
'সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালে অভিভাবকেরা আসছেন তাদের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে। কিছু শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ শিশুকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সময়মতো অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে সঠিক চিকিৎসা সম্ভব,' বলেন তিনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগ চিকিৎসক মাহফুজুর রহমান বলেন, 'শীতকালে শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের সব সময় গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা, ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখা, বুকের দুধ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা আবশ্যক। পাশাপাশি সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। '
'শীতকালে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের চরম উৎকণ্ঠায় দেখা যাচ্ছে। উৎকণ্ঠায় না থেকে ঠান্ডা থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে শিশুরা অসুস্থ হবে না,' তিনি বলেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, 'শীতকালে বিশেষ করে শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীদের উপচেপড়া ভিড় থাকে। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা হাসপাতালে ভিড় করছেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
'প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলো থেকে শিশু রোগী নিয়ে আসা হচ্ছে এখানে। এসব শিশুর অনেকেরই অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন শিশুদের নিবিড় চিকিৎসাসেবা দিতে,' তিনি বলেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, মঙ্গলবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রংপুরে ১১ দশমিক ৯, কুড়িগ্রামে ১০ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৮, গাইবান্ধায় ১০ দশমিক ৯, নীলফামারী ও দিনাজপুরে ৯ এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দিনভর দেখা মিলছে না সূর্যের। সেই সাথে হিমেল বাতাস ও কুয়াশা থাকায় কনকনে ঠান্ডার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।


Comments