যত গুড় তত মিষ্টি

‘সেবা চাই, কিন্তু শোষণ ছাড়ব না’ দ্বন্দ্বে ইন্টারনেট খাত

ইন্টারনেট সংযোগ
ছবি: সংগৃহীত

আমরা যারা ইন্টারনেট খাতে কাজ করছি, তারা প্রতিনিয়ত দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই।

  • ইন্টারনেট কেন এত ব্যয়বহুল?
  • সেবা (QoS) কেন প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়?

জনগণের প্রত্যাশা থেকে সরকার চায় ইন্টারনেটের দাম হোক সবার নাগালে। একই সঙ্গে চায়, সেবার গুণগত মান হোক উন্নত ও টেকসই।

এই চাওয়াগুলো নিঃসন্দেহে যৌক্তিক এবং যারা আইএসপি খাতে আছি, তারাও এই লক্ষ্যেই কাজ করছি। কিন্তু বাস্তবতা কি সেই আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে? 'যত গুড় তত মিষ্টি'—এই সহজ কথাটা কি নীতিনির্ধারকরা মন থেকে মানেন?

দেশের প্রান্তিক কোনো গ্রাহক যখন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেই সংযোগটি আসে আইএসপির মাধ্যমে। কিন্তু এই আইএসপি অপারেটরগুলোর নিজস্ব ব্যান্ডউইডথ থাকে না।

ব্যান্ডউইডথ আসে কীভাবে?

  • আইএসপি ব্যান্ডউইডথ কেনে আইআইজি থেকে
  • আইআইজি ব্যান্ডউইডথ কেনে আইটিসি ও বিএসসিসিএল থেকে
  • প্রতিটি স্তরে ব্যান্ডউইডথ পরিবহন করে এনটিটিএন

এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকার বসিয়েছে একাধিক কর ও অংশীদারিত্ব:

  • প্রতিটি স্তরে ৫ শতাংশ ভ্যাট
  • প্রতিটি স্তরে ১ শতাংশ এসওএফ
  • প্রতিটি স্তরে ৫ শতাংশ উৎসে কর
  • আইআইজি থেকে ১০ শতাংশ রেভেন্যু শেয়ার
  • আইটিসি, বিএসসিসিএল ও এনটিটিএন থেকে ৩ শতাংশ রেভেন্যু শেয়ার

এভাবে ইন্টারনেট ভ্যালুচেইনে সরকারের অংশীদারিত্ব দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশে।

অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা

  • ভারতে ইন্টারনেট খাতে ট্যাক্স ও চার্জ মিলিয়ে সরকারের অংশ মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ।
  • মালয়েশিয়ায় সরকার ৬ শতাংশ ভ্যাট নেয়, কিন্তু কোনো রেভেন্যু শেয়ার নেই।
  • ইন্দোনেশিয়ায় ইন্টারনেটে ট্যাক্সের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ। এই দেশের সরকার ইন্টারনেটের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করে।

বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ রাজস্ব নিয়ে নেয়, কিন্তু খাতভিত্তিক কোনো ভর্তুকি বা অবকাঠামোগত সহায়তা করে না।

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে—এত কর ও রেভেন্যু শেয়ার কেটে নেওয়ার পরেও আইএসপি কীভাবে কম দামে ভালো মানের ইন্টারনেট দেবে?

ইন্টারনেটের গুণগত মান নিয়ে জখন আলাপ হয়, তখন সেটা শুধু গতি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে লেটেন্সি, প্যাকেট লস, আপটাইম, ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এবং কাস্টমার কেয়ার।

এই প্রতিটি বিষয়ে বিনিয়োগ করতে হয়, লোকবল রাখতে হয়, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়। অথচ সরকার যখন একদিকে রাজস্ব আদায়ে দৃঢ়, অন্যদিকে দাম কমাতে বলে, তখন আমাদের অবস্থান হয় চাপের মুখে পড়া মধ্যবিত্তের মতো।

এই বিপুল রাজস্ব সরকার কোন খাতে ব্যয় করছে? ইন্টারনেট খাতের টেকসই উন্নয়নে কি এর সামান্য অংশও বিনিয়োগ হচ্ছে? লাইসেন্স নবায়ন, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা রিসার্চ ফান্ড—সবই কেবল আইএসপি সেবাদানকারীদের পকেট থেকেই যাবে?

আমরা ইন্টারনেট সেবাদানকারী হিসেবে দায় এড়াতে চাই না, বরং সেবার গুণগত মান বাড়াতে আগ্রহী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, যৌক্তিক কর কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।

আমাদের বিনীত অনুরোধ

আমাদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলার আগে একবার হিসাব করে দেখুন, আপনি যে খরচ দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, তার কতটা সরকারের ঘরে যাচ্ছে, আর কতটা আমাদের হাতে থাকছে।

আরও বিস্ময়কর হলো—যত সরকার এসেছে, কেউ এই ভ্যাট, ট্যাক্স, এসওএফ বা রেভেন্যু শেয়ার কমায়নি। তার ওপর প্রতিটি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাম কমানোর নির্দেশ আসে। কিন্তু কোনো সরকার কখনোই এসব ভ্যাট, ট্যাক্স বা রেভেন্যু শেয়ারে পরিবর্তন আনেনি। ফলে সব দায় এসে পড়ে আইএসপিদের ওপর, যেন আমরা ইচ্ছা করেই ইন্টারনেটের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছি বা গুণগত মান বজায় রাখছি না।

সরকার চায়—

  • দাম কমুক
  • গুণগত মান বাড়ুক
  • সরকারের ৫০-৫৫ শতাংশ রাজস্ব অপরিবর্তিত থাকুক

সরকারের এই ত্রিমুখী চাওয়া নীতিগতভাবে বিপরীতমুখী। এটা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত, আর গ্রাহক অসন্তুষ্ট। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি টিকে থাকতে, মান বাড়াতে, নতুন প্রযুক্তি আনতে।

আমরা দায়িত্ব এড়াতে চাই না। বরং একটি ন্যায্য কাঠামো চাই, যেখানে সরকার আমাদের অংশীদার হবে উন্নয়নে, শোষণে নয়।

এই মুহূর্তে আমাদের দরকার:

  • যৌক্তিক কর কাঠামো
  • ১ শতাংশ এসওএফ ফান্ডের পুনর্বিবেচনা
  • রেভেন্যু শেয়ারে পুনর্বিবেচনা
  • সরকারি বিনিয়োগ অথবা সহযোগিতা
  • একটিভ শেয়ারিং
  • আইএসপিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

আমরা নিজেদের খুশিমতো দাম রাখি না বা ইচ্ছাকৃতভাবে গুণগত মান হ্রাস করি না। বরং আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক জটিল ও অসম নীতির মধ্যে।

সরকার যদি মিষ্টি ফল চায়, তাহলে তাকে গুড়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তবেই দেশের ইন্টারনেট খাত সত্যিকার অর্থে টেকসই ও জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারবে।


মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম, সভাপতি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)

Comments

The Daily Star  | English

Bangladesh won’t travel to India for T20 World Cup

The Bangladesh Cricket Board (BCB) has decided not to send the national team to India for the upcoming ICC T20 World Cup, following a directors' meeting today, and has requested the ICC to change the venue.

1h ago