হাওরের রাত যেন পাখিদের জন্য আতঙ্ক

ছবি: স্টার

হাওরের রাত থাকে নিস্তব্ধ। আর রাত নামলেই জাল পেতে কিংবা বন্দুক হাতে শুরু হয় দেশি–বিদেশি পরিযায়ী পাখি শিকার। শীত মৌসুম এলেই সিলেটের হাওরাঞ্চলে বেড়ে যায় অবৈধভাবে পাখি ধরার তৎপরতা। 

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের কাউয়াদীঘি হাওরপারের ওয়াপদা–কাশিমপুর হাটে কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, আজ অবশ্য হাটে কোনো পাখি দেখা যায়নি। কিন্তু শীত শুরু হলেই শিকারিরা আবার বেরিয়ে পড়ে। অধিকাংশই চুপিসারে বিক্রি হয়।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবিও একই—পরিযায়ী পাখির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শিকারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, আর কারবার চলে আড়ালে।

হাট থেকে ফেরার পথে ওই এলাকায় দেখা যায় পাখি ধরার জন্য পাতা বড় বড় জাল। বহু খুঁটির সঙ্গে বাঁধা এসব জাল রাতে উড়ে বেড়ানো পাখিদের ফাঁদে ফেলার জন্যই পাতা হয়। রাতভর আটকা পড়ে থাকা পাখিগুলো সকালে পেশাদার শিকারিরা নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে বা স্থানীয় বাজারে গোপনে বিক্রি করে।

স্থানীয়রা জানান, শুধু জাল নয়, বন্দুক ও এয়ারগান ব্যবহার করেও পাখি শিকার হচ্ছে। হাওরপারের অনেক ঘরে রাতে আশ্রয় নেয় বক, পানকৌড়ি ও অন্যান্য পরিযায়ী পাখি। সকালে তারা দল বেঁধে মাঠে যায়; সন্ধ্যায় ফিরে আসে। আর রাতের অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে গুলি করে এগুলো ধরে শিকারিরা।

হাইল হাওরের বাসিন্দা সাহেদ মিয়া বলেন, হাইল হাওর ছাড়াও কমলগঞ্জের আদমপুর, ইসলামপুর, হাজীপুরসহ বেশ কয়েক জায়গায় শিকার করা পাখি বিক্রি হয়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, অবাধ শিকারে পাখির আবাস্থল সংকুচিত হচ্ছে; প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। পরিযায়ী পাখির যে মৌসুম, সেই সময়েই শিকারিরা সবচেয়ে সক্রিয়।

মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল মুহাইমিন মিল্টন বলেন, প্রত্যন্ত হাওর-বিল থেকে ধরা পাখিগুলো গোপনে বিক্রি হয়। অনেক গ্রামবাসী এখনো জানেন না যে পাখি শিকার বেআইনি। তাই আইন, সচেতনতা ও নিয়মিত অভিযান—সবই দরকার।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন–২০১২ অনুযায়ী, বন্যপাখি হত্যা, আহরণ, বিক্রি, কেনা বা রাখার শাস্তি— সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়দণ্ড। পুনরায় অপরাধ করলে শাস্তি বাড়ে। মুহাইমিন মিল্টন বলেন, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এই আইনের প্রয়োগ দুর্বল।

হাকালুকি, কাউয়াদীঘি এবং হাইল হাওর এলাকায় রাতের অন্ধকারে জাল পেতে শিকার বাড়ছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই হাকালুকিতে বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি মারার অভিযোগও পাওয়া যায়।

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে ভিন্ন ছবি। গত ২ ডিসেম্বর দুইটি কালেম পাখি এবং ১৩ নভেম্বর চারটি সরালি হাঁস উদ্ধার করে অবমুক্ত করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু স্থানীয়রা বলছেন, গোপনে যে শিকার হয়—তার খবর খুব কমই সামনে আসে।

সম্প্রতি পরিবেশকর্মী তুহিন জুবায়ের শ্রীমঙ্গলের মীর্জাপুর শাপলা বিলে ধারণ করা একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যায়, নৌকার ভেতর বাঁধা দুটি বক এবং এক শিকারির হাতে ঝুলছে আরও দুটি বক।

তিনি বলেন, আমরা সেদিন ভোরবেলা হাইল হাওড়ে শাপলার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। পাখি শিকারিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন পাখিগুলো মারছেন? সেতো হেসে হেসে বলে আমিতো প্রত্যেকদিন পাখি শিকার করি।কেউ বাধা দেয় না।ছবি তোলার চেষ্টা করলে তিনি হুমকি দেন। উল্টো বলে, 'ছবি তুললে এখান থেকে ফিরে যেতে পারবেন না।' যদিও গোপন ক্যামেরায় তার ভিডিও করেছিলাম।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, হাট–বাজারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হচ্ছে। তথ্য পেলে দ্রুত যাই। হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, ভৈরববাজার—সব জায়গায় অভিযান হয়েছে। কিন্তু জনবল কম থাকায় শিকার পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে ৮২টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই পাখি। তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আলাদা অফিস থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। শিকার–ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
 

Comments

The Daily Star  | English
Khaleda Zia political legacy in Bangladesh

The magic of Khaleda Zia

Her last speeches call for a politics of ‘no vengeance’.

1d ago