শত্রু যখন বন্ধু: ভেনেজুয়েলার ‘বাঘিনী’ দেলসির ওপর কতদিন ভরসা করবেন ট্রাম্প
গত শনিবার মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলাকে চালাবে।
এর মধ্যে গতকাল সোমবার ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট 'স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী' দেলসি রদ্রিগেজ। ট্রাম্পের এক ধরনের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি।
দেলসির এই শপথগ্রহণকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিভ্রান্তিকর মোড় বলে অভিহিত করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
পৃথিবীতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—ট্রাম্প কেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বেছে নিলেন দেলসিকে? কতদিনই বা ভরসা করবেন তাকে?
দেলসির অপ্রত্যাশিত নেতৃত্ব
প্রাথমিকভাবে, মাদুরোর বিকল্প মনে করা হচ্ছিলো হোয়াইট হাউসের দীর্ঘদিনের মিত্র নোবেলজয়ী বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে।
কিন্তু, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এক সমাজতান্ত্রিক শাসককে উৎখাত করে সেই শাসকেরই ডান হাতের কাছে ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, নিজ দেশে মাচাদোর 'সমর্থন' নেই বলে উপেক্ষা করেছে ট্রাম্প। এর পরিবর্তে তিনি সমর্থন দিয়েছেন গেরিলা যোদ্ধার কন্যা দেলসি রদ্রিগেজকে।
গ্রেট আমেরিকার মুখোমুখি মার্ক্সবাদ
দেলসি রদ্রিগেজ মুক্তবাজারপন্থী রক্ষণশীল নেতা নন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার বিপ্লবী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন এতদিন।
টাইম ম্যাগাজিন জানিয়েছে, দেলসির বাবা মার্ক্সবাদী নেতা হোর্হে আন্তোনিও রদ্রিগেজকে ১৯৭৬ সালে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। আর এই ট্রমাকেই ডেলসি তার বিপ্লবী রাজনীতির শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন সবসময়।
আল জাজিরার তথ্যমতে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে আগ্রাসী অবস্থানের কারণে মাদুরো নিজেই তাকে 'বাঘিনী' বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবুও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, দেলসি 'ভদ্র' এবং ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করতে আমরা যা প্রয়োজন মনে করি—তা করতেও তিনি প্রস্তুত।
এখানেই মার্কিন নীতি আর ভেনেজুয়েলার নতুন নেতৃত্বের বৈপরীত্য স্পষ্ট।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইতোমধ্যে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে দেলসিকে সহায়তার বিষয়ে কথা বলেছেন।
কিন্তু মাদুরোকে 'তুলে নিয়ে যাওয়ার' পর দেলসি রদ্রিগেজের প্রকাশ্য অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। টেলিভিশনে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে 'নৃশংস আগ্রাসন' বলে নিন্দা করেন। এ ঘটনাকে 'অপহরণ' আখ্যা দেন। সেই সঙ্গে ঘোষণা করেন, 'আর কখনোই আমরা দাস হব না।'
এই বৈপরীত্য অবশ্য এখনো ট্রাম্পের জন্য একটি বড় বাজি।
আর সেই বাজি ধরেই ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিককে বলেছেন, 'তিনি (দেলসি) যদি সঠিক কাজ না করেন, তাহলে তাকে খুব বড় মূল্য দিতে হবে।'
তবে নিউইয়র্ক টাইমস দেলসির ওই রাজনৈতিক হুঁশিয়ারিকে অনেকটাই 'জনসংযোগের কৌশল' হিসেবে দেখছে। তারা জানিয়েছে, আগ্রাসী হুমকির মধ্যেও ডেলসি ও ট্রাম্প—দুজনেই দুই দেশের মধ্যে একটি 'নির্দিষ্ট মাত্রায়' সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি
ট্রাম্প কেন মাচাদোর মতো মার্কিনপন্থী বিরোধীর বদলে মাদুরোর শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা দেলসিকে বেছে নিলেন? এর উত্তর অবশ্য নিহিত আছে তেল বাণিজ্য ও তার রাজনৈতিক দক্ষতার মধ্যে।
সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে দেলসি এমন একজন টেকনোক্র্যাট—যিনি ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম, যা বিভক্ত বিরোধীরাও পারবে না।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ২০২০ সাল থেকে রদ্রিগেজ একইসঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং অর্থ ও তেল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। চরম মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রচলিত নীতি ভেঙে ভেনেজুয়েলাকে মুক্তবাজারমুখী করেন। আর এর মাধ্যমেই মার্কিন সরকার ও ওয়াল স্ট্রিটকে প্রভাবিত করেছেন তিনি।
মাদুরোকে আটকের পরদিনই ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি চান মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করুক।
আল জাজিরা জানিয়েছে, দেলসি তার আগের বক্তব্য ছাপিয়ে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্প ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
কারাকাসভিত্তিক সাংবাদিক ফার্নান্দেজ আল জাজিরাকে বলেন, সরকার পরিচালনায় তার অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই আলোচনা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রশাসনের সূত্রগুলোর বরাতে টাইম জানিয়েছে, দেলসি স্থায়ী সমাধান না হলেও মাদুরোর তুলনায় তার সঙ্গে অনেক বেশি পেশাদারত্ব বজায় রেখে কাজ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
আল জাজিরা এটিকে 'আদর্শগত শাসনের পরিবর্তন থেকে সরে এসে লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির দিকে মোড়' বলে অভিহিত করেছে।
তাই মাচাদোর মতো গণতান্ত্রিক আদর্শবাদীকে ক্ষমতায় বসানোর চেয়ে ট্রাম্প তেলের তাৎক্ষণিক প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
হুমকির ওপর দাঁড়ানো সম্পর্ক
দেলসিকে সমান অংশীদারত্বের প্রস্তাব দেননি ট্রাম্প। আটলান্টিকের সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। সেই বার্তাটিও স্পষ্ট—হয় সহযোগিতা করুন, নয়তো পূর্বসূরীর পরিণতি ভোগ করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির ভাষ্য, দেলসি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন। প্রাণে বাঁচতে তাকে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতেই হবে। কিন্তু কারাকাসে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে তাকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জনসমর্থনও ধরে রাখতে হবে।
ইতোমধ্যে তিনি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত ও দেশ রক্ষা করার শপথ নিয়েছেন। কাজ করবেন সেই একই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে—যারা নিয়োজিত ছিল মাদুরোর ভেনেজুয়েলা রক্ষায়।
ফরেন পলিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেলসি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দেন—বিশেষ করে তেলের সার্বভৌমত্বে, তাহলে নিজের শিবির থেকেই অভ্যুত্থানের ঝুঁকি তৈরি হবে।
আমেরিকার কাছে একটি বড় ঝুঁকি হলো ডেলসির একেক সময়ের একেক বয়ান।
টাইম ও আল জাজিরা জানিয়েছে, ট্রাম্প দাবি করেছেন রদ্রিগেজ 'আগ্রহী' এবং 'ভদ্র'।
ফরেন পলিসি ও দ্য আটলান্টিক তার 'কঠোর' ভাষণের কথা তুলে ধরে বলছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে নৃশংসতা বলে অভিহিত করেছেন এবং মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছেন।
এই ব্যবধান যদি আরও বাড়ে, তবে আনুগত্য ও প্রকাশ্য প্রশংসাকে গুরুত্ব দেওয়া ট্রাম্প দ্রুতই ধৈর্য হারাতে পারেন।
ভূ-রাজনৈতিক বাজি
মাদুরোকে 'তুলে নিয়ে যাওয়া'র পর পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প আটলান্টিককে বলেছেন, তার বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম গোলার্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে তিনি উনিশ শতকের 'মনরো ডকট্রিনের' একটি নিজ সংস্করণের কথা উল্লেখ করেন। আগের নীতি পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
ট্রাম্প তার নতুন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে 'ডনরো নীতি' বলে অভিহিত করেছেন বলে জানিয়েছে আটলান্টিক-যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থাকবে সবচেয়ে বেশি।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটকের সিদ্ধান্ত কেবল ভৌগোলিক কারণেই নেওয়া হয়নি।
বিবিসি বলছে, বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানির মজুদ কোনো 'অবৈধ নেতার' হাতে ছাড়া হবে না—এই যুক্তিতে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের আয়ত্তে আনার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে দ্য আটলান্টিক বলছে, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলার কথা বলে ট্রাম্প আরও বিস্তৃত হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দিচ্ছেন। এমনকি ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর গ্রিনল্যান্ড দখলের ওপর জোর দিচ্ছেন।
আর এই কৌশলের কেন্দ্রীয় কড়িকাঠই হলেন রদ্রিগেজ।
কতদিন স্থায়ী হবে ট্রাম্প-ডেলসি সম্পর্ক
দেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। কিন্তু দেলসির বক্তব্য, ঝুঁকি, গ্রহণযোগ্যতা—এসব কিছু বিবেচনায় এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর।
যুক্তরাষ্ট্র তাকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছে তেল শিল্প সামলাতে পারবেন বলেই।
অন্যদিকে তিনি এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য কাজ করছেন যিনি চান সার্বভৌমত্ব ভুলে গিয়ে ভেনেজুয়েলা 'আত্মসমর্পণ' করুক।
কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতিতে দেলসি রদ্রিগেজ যদি সব পক্ষকে সামলাতে না পারেন, কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত এই নারীর বিরুদ্ধে রিপাবলিকানরা আরও কঠোর অবস্থান দাবি করে—তাহলে এই অন্তর্বর্তী লেনদেনের সম্পর্ক ভেঙে পড়বে।
আপাতত ট্রাম্পের হুমকির মধ্যে দেলসি কার্যত মাথায় বন্দুক ঠেকানো অবস্থাতেই দেশ শাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।


Comments