গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক কী, গ্রিনল্যান্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। এই দ্বীপটিকে অনেকেই এখনও ডেনমার্কের 'উপনিবেশ' বা 'বিদেশি অঞ্চল' বলে মনে করেন। বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড উপনিবেশ নয়, আবার পুরোপুরি স্বাধীন দেশও নয়। তাহলে গ্রিনল্যান্ড আসলে কেমন জায়গা? ডেনমার্কের সঙ্গে দ্বীপটির সম্পর্কই বা কী?
এক কথায় বললে, গ্রিনল্যান্ড স্বায়ত্তশাসিত একটি দ্বীপ। এটি ডেনমার্ক রাজ্যের (কিংডম অব ডেনমার্ক) অংশ হিসেবে আজও টিকে আছে।
কীভাবে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ হয়েছিল, আবার কীভাবে স্বায়ত্তশাসন পেল, কেন দ্বীপটি এত গুরুত্বপূর্ণ—এসব জানব এই লেখায়।
যেভাবে উপনিবেশ থেকে স্বায়ত্তশাসন পায় গ্রিনল্যান্ড
গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয়দের যাতায়াত শুরু হয়েছিল বহু আগে ১০ম শতাব্দিতে। ওই সময় ছিল ভাইকিংদের যুগ। এই ভাইকিংরা ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার জলদস্যুদের দল। তারা পুরো ইউরোপজুড়ে লুটতরাজ চালাত এবং বসতি গড়ে তুলতো। এই ভাইকিংরাই প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে এসেছিল।
গ্রিনল্যান্ড নাম নিয়েও একটা ইতিহাস আছে। এরিক দ্য রেড নামে আইসল্যান্ডের এক খুনি এই দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে এসেছিলেন। তিনি এই দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন গ্রিনল্যান্ড। নর্স এই অভিযাত্রী গ্রিনল্যান্ডে প্রথম ইউরোপীয় বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে ধরা হয়।
গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সরাসরি শাসন শুরু হয় অনেক পরে, ১৭২১ সালে। সে বছর নরওয়ের একজন ধর্মযাজক হান্স এগেদে ডেনমার্ক–নরওয়ে রাজ্যের (তখন দুটো অঞ্চল মিলে একটাই রাজ্য ছিল) অনুমতি নিয়ে গ্রিনল্যান্ডে যান। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম প্রচার, কিন্তু এর মধ্য দিয়েই গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের উপনিবেশ শুরু হয়।
এরপর প্রায় দুই শতাব্দীর বেশি সময় গ্রিনল্যান্ড ছিল ডেনমার্কের একটি উপনিবেশ। এই সময়ে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসন ও অর্থনীতি সবই পরিচালিত হতো ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে। গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় মানুষের হাতে নিজেদের দেশ চালানোর ক্ষমতা ছিল খুবই সীমিত।
১৯৫৩ সালে একটি বড় পরিবর্তন আসে। ডেনমার্ক তার সংবিধান সংশোধন করে গ্রিনল্যান্ডকে উপনিবেশের মর্যাদা থেকে সরিয়ে ডেনমার্কের মূল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করে নেয়। এর মানে হলো গ্রিনল্যান্ড আর 'উপনিবেশ' নয় এবং গ্রিনল্যান্ডবাসী ডেনিশ নাগরিকত্ব পায়। তারা ডেনিশ আইনসভায় প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকারও পায়।
তবে এই পরিবর্তনের পরও গ্রিনল্যান্ড নিজের মতো করে শাসনকাজ চালাতে পারত না। বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তখনও ডেনমার্কই নিত।
দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের পর ১৯৭৯ সালে গ্রিনল্যান্ড হোম রুল বা আংশিক স্বায়ত্তশাসন পায়। এই ব্যবস্থার ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব আইনসভা গঠিত হয়, স্থানীয় সরকার তৈরি হয় এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, স্থানীয় প্রশাসনের মতো বিষয়গুলো গ্রিনল্যান্ড নিজেই পরিচালনা করতে শুরু করে। এটা ছিল গ্রিনল্যান্ডের জন্য এক বড় রাজনৈতিক অগ্রগতি, কারণ তারা নিজস্ব সংসদ, সরকার ও প্রধানমন্ত্রী পায়।
এরপর ২০০৯ সালে কার্যকর হয় পূর্ণ স্বশাসন আইন (সেল্ফ-গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট)। এই আইনের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের সরকার আরও বেশি ক্ষমতা পায়। প্রাকৃতিক সম্পদ (খনিজ, তেল, গ্যাস) ব্যবহারের অধিকার গ্রিনল্যান্ডের হাতে আসে। গ্রিনল্যান্ডিক ভাষা একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ভবিষ্যতে স্বাধীন হওয়ার আইনি পথও খুলে যায়। এই আইনে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ চাইলে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
ডেনমার্কের হাতে কী আছে?
এতকিছুর পরও গ্রিনল্যান্ড পুরোপুরি স্বাধীন অঞ্চল নয়। ডেনমার্কের হাতে এখনো পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক প্রতিরক্ষা, নাগরিকত্ব ও মুদ্রানীতির মতো বিষয়গুলো আছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিরা ডেনমার্কের আইনসভায় অংশ নেন, যা দুই পক্ষের সাংবিধানিক সম্পর্ককে দৃঢ় করে। যদিও ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের সরাসরি (ফ্লাইট) রুট অনুযায়ী দূরত্ব প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ কিলোমিটার।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ডেনমার্ক আছে, গ্রিনল্যান্ড নয়
ডেনমার্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হলেও গ্রিনল্যান্ড ইইউ বা শেনজেন অঞ্চলের অংশ নয়। শেনজেন অঞ্চল হলো ইউরোপের কয়েকটি দেশের মধ্যে করা একটি চুক্তিভিত্তিক অঞ্চল, যেখানে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সীমান্তে পাসপোর্ট বা ইমিগ্রেশন চেক ছাড়াই মানুষ চলাচল করতে পারে। গ্রিনল্যান্ড কার্যত একটি স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক সত্তা, যার আলাদা বাণিজ্যিক ও অভিবাসন নীতি রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড পরিচিতি
গ্রিনল্যান্ড আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একটি দ্বীপ। আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে অবস্থিত এই দ্বীপটি আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ, যা একে ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গ্রিনল্যান্ড আয়তনে বিশাল, প্রায় ২১ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু এ অঞ্চলের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের মতো। এর ৮০ শতাংশের বেশি অংশ বরফে ঢাকা। দ্বীপটির রাজধানীর নাম নুক। এখানকার বেশিরভাগ মানুষের পেশা মাছ শিকার করা।
গ্রিনল্যান্ডের মানুষের বেশিরভাগই ইনুইট বা কালাল্লিত জনগোষ্ঠীর, যাদের সংস্কৃতি ও ভাষা কানাডার ইনুইটদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ২০০৯ সাল থেকে স্থানীয় গ্রিনল্যান্ডিক (কালাল্লিসুট) এখানকার একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা।
শহরের বাইরে যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে হলে রাস্তা নয়, নির্ভর করতে হয় বিমান, নৌকা বা হেলিকপ্টারের ওপর। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা দ্বীপটির অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কঠিন করে তুলেছে।
গ্রিনল্যান্ড কি স্বাধীন হতে চায়?
গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ স্বাধীনতা চায়। তবে তারা এমন স্বাধীনতা চায় না, যা তাদের কল্যাণব্যবস্থা ভেঙে দেবে।
গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসন আইন অনুযায়ী, ডেনমার্ক দ্বীপটিকে প্রতিবছর ৩ দশমিক ৪ থেকে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ড্যানিশ ক্রোনার অনুদান দেয়, যা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।
দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলাও ডেনমার্কই নিশ্চিত করে। এসব নির্ভরতার কারণে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এখনও প্রবল হয়ে ওঠেনি বলে মনে করা হয়।
গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি বরফে ঢাকা দ্বীপ নয়। এর ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আর্কটিক অঞ্চলের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। আজও নর্থ গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে শুরু করেছে, উন্মুক্ত হচ্ছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও নতুন নৌপথ। ফলে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল হয়ে উঠছে।
২০২৩ সালের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে 'গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টি গ্রিনল্যান্ডে আছে।
অঞ্চলটিতে পাওয়া মূল্যবান খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে বিরল মৃত্তিকা উপাদান, সোনা, হীরা, তামা, গ্রাফাইট, ইউরেনিয়াম, সোনা, জিঙ্ক বা দস্তা, লোহার আকরিক, তামা, নিকেল, টাইটেনিয়াম, ভ্যানাডিয়াম, টাংস্টেনসহ আরও অনেককিছু।

Comments