এক্সপ্লেইনার

গ্রিনল্যান্ড ‘দখলে’ ট্রাম্পের চাপ, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কি সংকটে

ছবি: এপি

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনা কূটনৈতিক কৌতূহল থেকে ধীরে ধীরে উত্তর আটলান্টিক জোট বা ন্যাটোর জন্য একটি অস্তিত্বগত সংকটে রূপ নিচ্ছে।

বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ইউরোপীয় মিত্ররা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে—যা জোটের অভ্যন্তরীণ সংহতিতে ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—ন্যাটোর ভেতরের ঐক্য কি সত্যিই হুমকির মুখে পড়েছে?

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব

আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় ১৫ গুণ বড় গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে শক্তিনির্ভর ভূরাজনীতি—যার উৎস দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার জন্য এলাকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কার্যকর সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়।

তবে সামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ চীনে রপ্তানি ঠেকানোও যুক্তরাষ্ট্রের বড় লক্ষ্য। ট্রাম্প প্রশাসন উত্তর গোলার্ধে 'নিরাপত্তা শূন্যতা'র যুক্তি তুলে ধরে এ অবস্থানকে ন্যায্যতা দিতে চাইছে।

ট্রাম্পের দাবি, ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করার মতো সক্ষমতা নেই এবং দ্বীপটির আশপাশ ঘিরে রয়েছে রুশ ও চীনা জাহাজ।

ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেনের বক্তব্য, গ্রিনল্যান্ডজুড়ে চীনা যুদ্ধজাহাজ ঘোরাফেরার দাবি 'সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন'।

তবে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে, দ্বীপটি অধিগ্রহণ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কূটনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে চাপ প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছেছে—যা তাদের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল দ্বীপটি কিনে নেওয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, রুবিও ডেনমার্ককে আলোচনায় বসতে চাপ প্রয়োগের কথা বলেছেন।

একইসঙ্গে হোয়াইট হাউস বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামরিক শক্তি ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপ্রধানের হাতে থাকা একটি বিকল্প।

ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। 

দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, এই নীতির পেছনে রয়েছেন হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টিফেন মিলার। তিনি বলেছেন, 'আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করি…যা শক্তি, বলপ্রয়োগ এবং ক্ষমতা দ্বারা শাসিত।'

স্টিফেন মিলারের স্ত্রী গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা বসিয়ে 'শিগগির' ক্যাপশনসহ একটি পোস্ট দেওয়ার পর প্রশাসনের আক্রমণাত্মক মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেনমার্ককে পাশ কাটিয়ে সরাসরি গ্রিনল্যান্ডবাসীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বিশেষ দূত নিয়োগের কথাও ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র—যা ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ছবি: রয়টার্স

ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া

আল জাজিরা জানায়, ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

গ্রিনল্যান্ডের সরকারও স্পষ্ট করে বলেছে, দ্বীপটি কেবল এর জনগণের এবং বিক্রির জন্য নয়।

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেন যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে 'অগ্রহণযোগ্য ও অসম্মানজনক' বলে নিন্দা করেছেন।

ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেনও সতর্ক করে বলেছেন, এই চাপ অগ্রহণযোগ্য এবং ট্রাম্প সত্যিই এমন কিছু করতে পারেন।

ডেনমার্ক একা নয়। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো যৌথ বিবৃতিতে বলেছে—গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারও বলেন, 'গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক রাজ্যের হাতেই।'

ডয়চে ভেলের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রান্স-আটলান্টিক শুল্কচুক্তি স্থগিতের প্রস্তাবও উঠেছে।

ডেনিশ এমপি পার ক্লাউসেন বলেছেন, কোনো সদস্য রাষ্ট্র হুমকির মুখে থাকলে ওই বাণিজ্যচুক্তি মেনে নেওয়া ট্রাম্পের আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করার শামিল।

আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ইইউকে তার অর্থনৈতিক শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতির ওপর প্রভাব 

এই বিরোধ ন্যাটোর মৌলিক কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তায় গঠিত ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের একটি ডেনমার্ক।

তাই এ ঘটনা রাজনৈতিক মতভেদের গণ্ডি ছাড়িয়ে জোটের আইনি ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে।

ন্যাটো চুক্তির ভিত্তি অনুচ্ছেদ ৫-এ বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। 

ন্যাটোর প্রতিরোধ পরিকল্পনা সবসময়ই বহিরাগত শত্রুদের নিয়ে করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি অন্য সদস্যের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয়, সে বিষয়ে কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। 

আল জাজিরা জানিয়েছে, পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, এ ধরনের হুমকি ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করবে।

ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ন্যাটোর ভেঙে পড়ার শঙ্কা করেছেন।'

এদিকে ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনও সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপে ন্যাটো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে ডয়েচেভেলে।

স্টকহোম ফ্রি ওয়ার্ল্ড ফোরামের প্যাট্রিক অকসানেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশ করে, তাহলে 'ভূরাজনীতি সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা—তার অবসান ঘটবে।'

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এড আর্নল্ড মন্তব্য করেন, এই পরিস্থিতিতে ৩২টি মিত্র দেশ একই টেবিলে বসে আছে। আর মূল হুমকিটা আসছে টেবিলের চারপাশ থেকে। 

এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, এই মুহূর্তে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ না হলেও চলমান বাকযুদ্ধ যে ন্যাটোর মূল্যবোধ ও আস্থার ক্ষতি করছে। 

ডয়চে ভেলে জানায়, এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন তো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বিশাল বিজয়। 

তাছাড়া, ডেনিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ডেনমার্কের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার কথাও বলেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত নীতি তাই ঐতিহাসিকভাবে তাদের ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে হারানোর ইঙ্গিত দেয়।

ছবি: রয়টার্স

ন্যাটোর ভবিষ্যত

ন্যাটোর বর্তমান উত্তেজনাকে একটি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই বাহিনীর কাজ একটি শহরকে অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করা। কর্মকর্তারা সবাই বাইরের হুমকির বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করতেও রাজি।

কিন্তু যদি হঠাৎ করে পুলিশপ্রধান নিজ বাহিনীর এক কর্মকর্তার বাড়ি জোর করে দখল করার হুমকি দেন, তাহলে কী হবে? তখন পুরো বাহিনীর ভেতরেই সংকট তৈরি হবে। 

বিশ্বাস নষ্ট হবে, ঐক্য ভেঙে পড়বে, আর বাহিনী ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে যাবে।

গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ন্যাটোর জন্য ঠিক এমনই এক সংকটের মুহূর্ত। এক মিত্র দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্প খোলা রাখার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। 

অথচ এই নীতিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পশ্চিমা নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হয়ে আছে।

এই মার্কিন অবস্থানের জবাবে মিত্র দেশগুলোর কঠোর মনোভাবও জোটের ঐক্যকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এতে ন্যাটো ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

Comments

The Daily Star  | English