ভারতে বাংলাদেশি শনাক্তকরণ যন্ত্র আবিষ্কার?

‘নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যন্ত্র’ গায়ে ঠেকিয়ে ‘বাংলাদেশি’ শনাক্ত করছে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি প্রসঙ্গ আবারও আলোচনায়। ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতারা প্রায়ই 'বাংলাদেশি খুঁজে বের করার' হুমকি দিয়ে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেশটির এক পুলিশ কর্মকর্তা যেন বাংলাদেশি শনাক্তকরণ যন্ত্র 'আবিষ্কার' করে ফেললেন!

ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের রাজধানী দিল্লির অদূরে, উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে এই শহরের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে নেমেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই শহরের এক পুলিশ কর্মকর্তা বাংলাদেশি শনাক্তকরণ যন্ত্র 'আবিষ্কারের' কথা বলে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, অবৈধ অভিবাসী খুঁজতে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর গাজিয়াবাদের বিহারি মার্কেট এলাকার একটি বস্তিতে বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অভিযানে যান কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। সেসময় এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ব্যক্তির পিঠে মুঠোফোন ঠেকিয়ে বলেন, 'যন্ত্র বলছে এই ব্যক্তি বাংলাদেশি'।

এ প্রসঙ্গে দ্য হিন্দুর ২ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: 'ভিডিওতে দেখা গেল অভিযানের সময় হুমকির অভিযোগ, কর্মকর্তাকে হুঁশিয়ার করল পুলিশ'। এতে বলা হয়—ভিডিওতে দেখা গেছে যে পুলিশ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যন্ত্র ব্যবহার করে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্য থেকে অবৈধ বাংলাদেশি চিহ্নিত করছে।

সেদিন আনন্দবাজার এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে: ''নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যন্ত্র' গায়ে ঠেকিয়ে 'বাংলাদেশি' শনাক্ত করছে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ! বিতর্কের জেরে তদন্তের নির্দেশ'।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, গাজিয়াবাদের কৌশাম্বী থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এক বস্তিতে গিয়ে এক ব্যক্তির পিঠে মুঠোফোন ঠেকাচ্ছেন। তারপরই সেই ফোন দেখিয়ে সেই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন যে 'ওই ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন'।

একই দিনে হিন্দুস্তান টাইমসের বাংলা সংস্করণে এ ঘটনার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়: 'পিঠে ফোন ঠেকিয়েই বাংলাদেশি শনাক্তকরণ! গাজিয়াবাদ পুলিশের আজব কাণ্ডে তুঙ্গে বিতর্ক, তদন্তের...'।

সমাজমাধ্যমে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশের এমন আচরণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২ জানুয়ারি গাজিয়াবাদ পুলিশ কৌশাম্বী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বার্তা দিয়েছে। এক বস্তিতে গিয়ে বাসিন্দাদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, তার যন্ত্র দিয়ে একজনের নাগরিকত্ব শনাক্ত করা যায়।

কী ঘটেছিল সেদিন?

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন বলছে, সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে—সেই পুলিশ কর্মকর্তা স্মার্টফোনের মতো দেখতে একটি যন্ত্র এক ব্যক্তির পিঠে রেখে তার নাগরিকত্ব কী জানতে চান। তিনি প্রশ্ন করে, 'আপনি কি বাংলাদেশি? যন্ত্র বলছে আপনি বাংলাদেশি, তাই না?'

এর জবাবে সেই ব্যক্তি জানান, তিনি বিহারের আরারিয়া জেলার অধিবাসী।

এতে আরও বলা হয়—গাজিয়াবাদের ইন্দ্রপুরম এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার অভিষেক শ্রীবাস্তব গণমাধ্যমকে বলেছেন, 'সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তদন্ত করে জানা গেছে, ভিডিওটি কৌশাম্বী থানা এলাকার। স্থানীয় পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়েছিল। সেসময় সেখানকার অস্থায়ী বাসিন্দা ও বস্তিবাসীদের প্রশ্ন ও তাদের জবাব যাচাই করা হচ্ছিল।'

পুলিশ জানায়, সেদিনের অভিযানটি কারও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ছিল না। সেটা ছিল নিয়মিত তল্লাশি। অস্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি লুকিয়ে আছেন কি না। সাধারণত অপরাধ-দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এমন নিয়মিত অভিযান চালানো হয়।

আনন্দবাজারের ভাষ্য: ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—এক পুলিশ কর্মকর্তা বস্তিবাসীদের বলছেন, 'মিথ্যা বলবেন না। আমাদের কাছে একটা যন্ত্র আছে। সেখানে কিন্তু মিথ্যা ধরা পড়ে যাবে।' তারপরই একজনের পিঠে মোবাইল ফোন ঠেকিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে 'বাংলাদেশি' বলে শনাক্ত করেন।

সংবাদ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—সেই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'যন্ত্র বলছে এই ব্যক্তি বাংলাদেশি।'

পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ও এক নাবালিকা মোবাইলে থাকা পরিচয়পত্র দেখিয়ে পাল্টা দাবি করেন, তারা বিহারের আরারিয়ার বাসিন্দা। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা তা মানতে চাননি।

প্রতিক্রিয়া

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই 'বাংলাদেশি শনাক্তকরণের' ঘটনায় বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। 

উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি অজয় রায় বলেছেন, 'রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না। কেননা, নির্দেশনা আসছে ওপর থেকে।'

উত্তরপ্রদেশে এমন অবমাননাকর ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার আশা, উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

এই কংগ্রেস নেতার মতে, এ ঘটনা উত্তরপ্রদেশকে সবার কাছে হাস্যকর করেছে এবং এটি আইনের শাসনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

Comments