এ শহরের কাকেরা কোথায় গেল

এ শহরের কাকেরা কোথায় গেল
ছবি: ফিরোজ আহমেদ/স্টার

এক সময় ভোরের শহর মানেই কাকের ডাক কিংবা ছিল কাকডাকা দুপুর। ছাদের কার্নিশ, বৈদ্যুতিক তার কিংবা ডাস্টবিনের পাশ—সবখানেই তাদের অনিবার্য উপস্থিতি। সকাল শুরু হতো কর্কশ অথচ পরিচিত সেই স্বরে। কিংবা গ্রীষ্মের ছুটির দুপুর, স্কুল নেই, হোমওয়ার্ক নেই—শুধু অলস সময়। জানালার পাল্লা আধখোলা, বাইরে রোদ ঝলসে পড়ছে। ঠিক তখনই শুরু হতো 'কা...কা...কা...'। ঘুম আসত, আবার সেই ডাকেই ভেঙে যেত। বিরক্ত লাগত, তবু সেই ডাক ছাড়া দুপুরটা অসম্পূর্ণ ছিল।

আজকাল চোখে পড়ে না কাক, কানে আসে না সুপরিচিত সেই ডাক। প্রশ্নটা তাই অস্বস্তিকরভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়—এ শহরের কাকেরা কোথায় গেল? কাক ছিল শহরের সবচেয়ে খাপখাওয়া পাখি। সবকিছুর সঙ্গেই তাদের সহাবস্থান ছিল স্বাভাবিক। তারা ছিল নগরের অঘোষিত সাফাইকর্মী। কিন্তু শহরের চেহারা বদলাতে বদলাতে যেন কাকদের জায়গাটাই হারিয়ে গেল।

স্কুলের দিনের কথা মনে পড়ে। ভোরবেলা মা ডাকতেন, 'ওঠ, স্কুলে দেরি হবে'। উঠেই শুনতাম কাকের ডাক। মনে হতো, ওরাও বুঝি আমাদের মতোই ডিউটিতে বেরোচ্ছে। কলোনির সব ছাদের ওপর কাকেরা ছিল চিরচেনা বাসিন্দা। কেউ ভাত ফেলে দিলে তারা হাজির। কারও নতুন জামা শুকোতে দিলে সাবধান, কাক বসে পড়বে। তবু কারও রাগ হতো না। তারা ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

এখনো দুপুর আসে, যায়। জানালা খুললে এসির শব্দ, গাড়ির হর্ন। কিন্তু কাকের ডাক নেই। গ্রীষ্মের ছুটিও আর আগের মতো লাগে না। হয়তো ছুটি আছে, কিন্তু অলসতা নেই। মোবাইলের স্ক্রিনে সময় কেটে যায়, দুপুর ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগই মেলে না। আর ঘুম ভাঙানোর জন্য কেউ ডাকেও না।

কাকেরা কি শুধু পাখি ছিল? নাকি তারা ছিল সময়ের চিহ্ন? দুপুরের অলসতার সঙ্গী, ছুটির দিনের শব্দ, ছোটবেলার পটভূমির সংগীত? তাদের ডাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়ের বকুনি, দিদিমার গল্প, স্কুলব্যাগ ছোড়ার আনন্দ।

প্রথমেই আসে আবাসনের প্রশ্ন। একতলা-দোতলা বাড়ির জায়গায় উঠেছে বহুতল। কার্নিশ সরু হয়েছে, ছাদে খোলা জায়গা কমেছে। পুরোনো বট, অশ্বত্থ, শিরীষ কেটে ফেলা হয়েছে পার্কিং আর ফ্লাইওভারের জন্য। গাছ মানেই তো পাখির ঘর। গাছ কমলে বাসা কমে, ডিম পাড়ার জায়গা কমে।

তারপর আছে খাবারের সংকট। শহরে এখন 'ক্লিন সিটি' অভিযান। ডাস্টবিন ঢাকনাওয়ালা, আবর্জনা আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়। একদিকে এটা স্বাস্থ্যকর, নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর অপ্রত্যাশিত ফল হলো কাকের মতো স্ক্যাভেঞ্জার পাখিদের খাদ্যভাণ্ডার হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া। তারা তো শস্যখেতে শিকার করে না; মানুষের শহরই ছিল তাদের খাদ্যের প্রধান উৎস।

শব্দদূষণও কম দায়ী নয়। সারাক্ষণ হর্ন, নির্মাণকাজের আওয়াজ, জেনারেটরের শব্দ—এই কোলাহলে পাখিরা দিশেহারা হয়। কাক সামাজিক পাখি; ডাকাডাকি তাদের যোগাযোগের মাধ্যম। শহরের শব্দে সেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়। ধীরে ধীরে তারা এমন জায়গায় চলে যায়, যেখানে শোনা যায় নিজেদের ডাক।

কাকের অনুপস্থিতি শুধু নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এটা একটি পরিবেশগত সতর্কতা। কোনো বাস্তুতন্ত্রে স্ক্যাভেঞ্জার কমে যাওয়া মানে ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। শহর হয়তো চকচকে হয়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি আরও অসুস্থ হয়ে উঠছে না?

তবু আশার জায়গা আছে। ছাদবাগান, নগর বনায়ন, বিষমুক্ত পরিবেশ—এগুলো ফিরিয়ে আনলে পাখিরাও ফিরতে পারে। কাক খুব সহজে মানিয়ে নেয়, যদি আমরা তাদের জন্য একটু জায়গা রাখি। হয়তো একদিন আবার ভোরের শহরে শোনা যাবে সেই পরিচিত ডাক। তখন প্রশ্নটা বদলে যাবে, এ শহরের কাকেরা ফিরল কীভাবে?

এখন মাঝে মাঝে খুব ভোরে বা ভরদুপুরে, দূরে কোথাও ক্ষীণ একটা ডাক কানে আসে। মনে হয়, ভুল শুনলাম? না কি সত্যিই কেউ আছে? তখন বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার হয়। শুধু প্রশ্ন জাগে—এ শহরের কাকেরা কোথায় গেল? নাকি তারা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সেই পুরোনো দিনগুলোও নিয়ে গেল?

Comments

The Daily Star  | English