কোটি টাকা চাঁদা দাবি: পুলিশের ওপর নজরদারি করে ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি
কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার আগে ও পরে পুলিশের ওপর নজরদারি চালিয়ে গেছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা।
ঘটনাস্থলের মাত্র ৫০ গজের মধ্যে ভারী অস্ত্রসহ পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিল। তারপরও ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি করে পুলিশের সামনে দিয়েই মাইক্রোবাস করে পালিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা।
এমনকি ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা এ সম্পর্কে জানতে পারেন।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার সময় চট্টগ্রামভিত্তিক স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাতক সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে ওই বাড়ি লক্ষ্য করে ১৫ রাউন্ড গুলি করেছে। বাড়ির সামনে ও পেছনে গুলি করা হয়েছে। তবে কেউ হতাহত হননি। ঘটনার সময় ওই ব্যবসায়ী বা তার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ছিলেন।
মুজিবুর রহমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগে চট্টগ্রাম-১৬ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গা ঢাকা দেন।
মুজিবুর রহমান পুলিশকে জানিয়েছেন মাস দেড়েক আগে বিদেশি এক নম্বর থেকে কল করে দুই দফায় তার কাছে চাঁদা চাওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) না করলেও মৌখিকভাবে তিনি বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। চাঁদা না পেয়েই গুলি ছোড়েন সাজ্জাদের অনুসারীরা।
বড় সাজ্জাদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশ প্রাপ্ত আসামি। ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে তার নাম সাজ্জাদ হোসেন খান দেওয়া আছে। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর জেলায় জোড়া খুনসহ অন্তত ১০টি হত্যার ঘটনায় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষকে হত্যা করছেন, আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করছে।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, মুজিবুর রহমানকে হুমকির ঘটনার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে চন্দনপুরা এলাকায় তার বাসার অদূরে রাস্তার ওপর অস্থায়ী চেকপোস্ট চালু করে চকবাজার থানা পুলিশ। সেখান থেকেই তার বাসার আশেপাশের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা হতো।
পুলিশ ও ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতেও ওই চেকপোস্টে পুলিশের এক উপসহকারী পরিদর্শক ও তিনজন কনস্টেবল ছিলেন। তবে শুক্রবার ভোরের দিকে শীত বেশি থাকায় তারা পাশের একটি স্কুলের ভেতরে যান। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে মাইক্রোবাসে করে এসে হামলা করে পালিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা।
পুলিশ বলছে, আটজন হামলাকারীর সবাই মাস্ক পরিহিত ছিলেন।
চেকপোস্টে পুলিশের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির ওপর নজর রেখেই গুলি চালানো হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
'গুলির শব্দ শুনতে পায়নি পুলিশ'
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সকাল ৭টা ২৪ মিনিটে একটি সাদা রঙের নোহা মাইক্রোবাসে করে আসে অস্ত্রধারীরা। গলির মুখে গাড়ি রেখে হেঁটে পাঁচ যুবক ওই বাড়ির সামনে আসেন। বাকি তিনজন বাড়ির পেছনে অবস্থান নেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর একাধিক পিস্তল থেকে গুলি করেন তারা। এর পর সাড়ে ৭টার দিকে দৌড়ে গাড়ির দিকে পালিয়ে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির এক পুলিশ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন 'হামলার সময় পাশের একটি স্কুলে ছিলেন চারজন পুলিশ সদস্য। তাদের কাছে এসএমজি ছিল। কিন্তু তারা হামলাকারীদের দেখেননি। পুলিশের ওপর পুরোটা সময় নজরদারি করা হয়েছে। একাধিকবার ওই এলাকা রেকি করেছে অস্ত্রধারীরা।'
সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভুঁইয়া শুক্রবার দুপুরে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সকাল ১০টার দিকে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। বিস্তারিত জানান জন্য আজ সন্ধ্যায় কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বাড়িটির অদূরে পুলিশ চেকপোস্ট থাকার বিষয়টি স্বীকার করে সিএমপির সহকারী কমিশনার (চকবাজার জোন) তারিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এটা চকবাজার থানার নিয়মিত চেকপোস্ট। তবে ঘটনার সময় কেন সেখানে পুলিশ ছিল না, তারা কোথায় অবস্থান করছিল—এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরাও বিষয়টি (গুলির ঘটনা) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাননি।'
তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন রুটে অস্ত্রধারীরা নিরাপদে পালিয়ে যাবে, তার ছক একেই গুলির ঘটনা ঘটিয়েছে। গুলি করে গাড়ি নিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড হয়ে তারা পালিয়ে যায়। গাড়ি যাতে চিহ্নিত করা না যায়, সেজন্য ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করেছে।
তারিকুল ইসলাম বলেন, 'ফুটেজে আমরা গাড়ির নম্বর পেয়েছি, কিন্তু সেটি টেম্পার করা। ফলে গাড়িটি কার বা কোথায় চলাচল করে, তা চিহ্নিত করা যায়নি।'
'মামলা হয়নি এখনো'
এই গুলির ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় মুজিবর রহমান বলেছিলেন, তিনি এ ঘটনায় মামলা করবেন না। 'আমি আতংকে নেই। আমি এমন কোনো অপরাধ করেনি, যেখানে আমাকে আতংকে থাকতে হবে।'
লিখিত অভিযোগ দিবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দরকার কী এগুলো করার।'
তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ডিবিসহ পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
গত বছরের ১১ নভেম্বর নগরীতে গুলি করে একের পর এক হত্যার ঘটনায় এবার আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের দেখা মাত্রই এসএমজি থেকে ব্রাশফায়ার করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ।
ওয়ারল্যাস সেটে সিএমপির সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক মৌখিক নির্দেশনায় তিনি পুলিশের টহল পার্টি ও থানা পার্টিকে একযোগে এই নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনার পর টহল পুলিশ সদস্যদের এসএমজি দেওয়া হয় এবং কর্মকর্তাদের পিস্তল রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

Comments