সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো, ফলাফলে তিক্ততা
যখন কোনো দলের সিরিজে টিকে থাকতে ১৫০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় এক পর্যায়ে ৪৭ বলে ৬৫ রান দরকার পড়ে এবং হাতে থাকে ৭ উইকেট— তখন প্রয়োজন সংযম ও স্থিরতার, তাড়াহুড়োর নয়।
গত বুধবার চট্টগ্রামের বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে জাকের আলী যখন ব্যাট করতে নামেন, বাংলাদেশ তখন ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই ছিল।
কিন্তু এরপর যা ঘটে, তা যেন অহেতুক তাড়াহুড়োরই করুণ প্রতিচ্ছবি— একদিকে ছিলেন একাদশে নিজের জায়গা প্রমাণে মরিয়া একজন ব্যাটার, অন্যদিকে তাকে এমন পরিস্থিতিতে নামিয়ে দেওয়া টিম ম্যানেজমেন্ট।
প্রথম টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ৫ রান করায় নুরুল হাসান সোহানকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচের একাদশে একমাত্র পরিবর্তন হিসেবে জাকেরকে নেওয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কারণ, ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনের পারফরম্যান্সের মধ্যে ছিল স্পষ্ট বৈপরীত্য।
চলতি মাসের শুরুতে শারজায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে সোহান ছিলেন ব্যাট হাতে উজ্জ্বল। প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার পথে প্রতিটি ম্যাচেই অপরাজিত থেকে খেলেন ১৪৮.৮৪ স্ট্রাইক রেটে। বিপরীতে, সবশেষ এশিয়া কাপের পর থেকে জাকের ৯ ইনিংসে মাত্র ১০৯.১৭ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ১১৯ রান। এই সময়ে মারতে পেরেছেন স্রেফ দুটি ছক্কা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুরে সবশেষ ওয়ানডে সিরিজেও তিনি একাদশে সুযোগ পাননি।
'আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করি। সোহান কিন্তু আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই অপরাজিত ছিল। কিন্তু এক ম্যাচ খারাপ খেলাতেই তাকে বাদ দেওয়া হলো। এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে খেলোয়াড়দের পক্ষে ভালো করা কঠিন,' বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল।
জাকেরের তখন দায়িত্ব ছিল ক্রিজে থিতু থাকা তানজিদ হাসান তামিমকে সহায়তা দেওয়া। কিন্তু তিনি উল্টো মুখোমুখি হওয়া প্রথম ৭ বলেই মাত্র ২ রান করে চাপ বাড়িয়ে ফেলেন। রান রেটের চাহিদা বাড়তে থাকলে তানজিদ বড় শট খেলতে গিয়ে ৪৮ বলে ৬১ রানের ইনিংস খেলে রোমারিও শেফার্ডের বলে আউট হন। একই ওভারে জাকেরও ১৮ বলে ১৭ রানে বিদায় নেন। তার নড়বড়ে ইনিংসজুড়ে দেখা গেছে বারবার জোর করে লেগ সাইডে শট খেলার ব্যর্থ চেষ্টা।
'যে বলগুলো সে মিস করেছে, সেগুলোতে আসলে রান নেওয়ার সুযোগ ছিল— কখনও অফে, কখনও লেগে। কিন্তু সে কেবল এক দিকেই শট মারতে চায়। এতে বল মিসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাকে শটের বৈচিত্র্য আনতে হবে,' জাকেরের ব্যাটিং নিয়ে বলেন আশরাফুল।
বাংলাদেশের প্রাক্তন এই তারকা ক্রিকেটার রান তাড়ার কৌশলেরও সমালোচনা করেন, 'বাংলাদেশের সামগ্রিক টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতেই সমস্যা। সবাই শুধু পাওয়ার হিটিংয়ের দিকেই মনোযোগ দেয়। অথচ ১৫০ রান তাড়া করতে শুরু থেকেই বড় শট মারার দরকার পড়ে না। তারা সেদিন উইকেট ধরে রেখেছিল, ম্যাচটাকে কাছাকাছি নিয়েও গিয়েছিল, তবে শেষ করতে পারেনি। তামিম দারুণ খেলেছে, কিন্তু জাকেরের ডট বলগুলোই চাপ বাড়িয়েছে।'
এমন অহেতুক তাড়াহুড়োর মাশুল ছিল তিক্ত— ১৪ রানের হার এবং এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ হাতছাড়া। এখন বাংলাদেশের সামনে শুক্রবার হতে যাওয়া শেষ ম্যাচে শুধু হোয়াইটওয়াশ এড়ানো নয়, বরং নিজেদের খেলার দর্শন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নতুন করে মূল্যায়নের চ্যালেঞ্জও হাজির।


Comments