বয়স নিয়ে মিথ্যা বলেন? শুধু আপনি নন, প্রায় সবাই তাই করে!
আপনার জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্টে লেখা জন্মতারিখ আর সত্যিকার জন্মদিন কি একই? যদি এক হয়, তাহলে আপনাকে অভিনন্দন! কারণ বেশিরভাগ বাংলাদেশিরই এক্ষেত্রে দুটো জন্মতারিখ থাকে। একটি বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা হয়, আর অন্যটি 'আসল', যেটি উদযাপন করা হয়।
খুব কম ক্ষেত্রেই 'আসল' জন্মতারিখের সঙ্গে 'দাপ্তরিক' জন্মতারিখ মেলে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কেন এমন হয়?
আমি ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ছোট ছিলাম, তখন সাধারণ নিয়ম ছিল স্কুলে ভর্তির সময় বা জন্মসনদ করার সময় সন্তানের বয়স অন্তত এক বছর কমিয়ে দেওয়া হতো। যাতে সে প্রথম সারির স্কুলগুলোর ভর্তি পরীক্ষায় একাধিকবার অংশ নিতে পারে। অর্থাৎ কোনো শিশু প্রথমবার ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সে পরের বছর আবার চেষ্টা করতে পারত। যেহেতু এসব স্কুলগুলোয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য বয়স ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সেই দিনগুলোয় বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের চাকরি এত আকর্ষণীয় ছিল না। ফলে তখন সরকারি চাকরিই ছিল সবার আকাঙ্ক্ষিত। এক, দুই বা তার বেশি বছর বয়স কমিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো, ওই শিশুরা বড় হয়ে তুলনামূলক বেশি সময় সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় আবেদন করতে পারতেন। আবার একবার চাকরি পেয়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় তারা চাকরি করতে পারতেন।
আসল বয়স নিয়ে এই গোপনীয়তা একজন ব্যক্তির ওপর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন: এখনো যদি কেউ আমাকে বয়স জিজ্ঞেস করে, তাহলে আমি অস্বস্তি বোধ করি। আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই যে, আসল বয়স বলব নাকি দাপ্তরিক বয়স বলব।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের খুব খোলামেলাভাবে নিজেদের বয়স নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। যেন গোপন করার কিছু নেই। মনে মনে আমি ওদের মতো হতে চাই। কিন্তু আমি যে সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি, সেখানে বয়স নিয়ে আমেরিকানদের মতো এত স্পষ্টবাদী হওয়া সম্ভব না বোধহয়। কারণ বাংলাদেশে আমরা খুব সময়ই বয়স নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছি।
এমনকি আমাদের সংস্কৃতিতে কারও বয়স জিজ্ঞেস করাটাকেও অভদ্রতা মনে করা হয়। ফলে অনেক শিশুই তাদের বাবা-মায়ের সত্যিকার জন্মতারিখ কখনোই জানতে পারে না। আমাদের বাবা-মায়েরা তাদের আসল জন্মসাল সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
একবার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে আমরা বাংলাদেশি হিসেবে এত মিথ্যা বলি কেন? আমি জবাব দিয়েছিলাম, 'কারণ আমরা মিথ্যা বলতে বলতে বড় হই। আমরা সারাজীবন আমাদের বয়স নিয়ে মিথ্যা বলি। যখনই আমরা আমাদের জন্মতারিখ বলি বা লিখি, প্রতিবারই সেটা হয় মিথ্যা। এখন কল্পনা করুন, আমরা এর মধ্যে কতবার মিথ্যা বলেছি।'
আমার মনে হয়, এভাবে আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে মিথ্যা বলাকে স্বাভাবিক করে ফেলেছি।
স্বাস্থ্যসেবা
আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি যাদের বয়স তিন বা চার বছর পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যক্তিরা যখন চিকিৎসকের কাছে যান এবং নিজেদের সার্টিফিকেটের বয়স বলেন, তখন তারা আসলে চিকিৎসক বা নিজেকে সাহায্য করেন না।
উদাহরণস্বরূপ: কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা ও প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাদানের ক্ষেত্রে বয়স গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: সাধারণত ৪৫ বছর বয়সে কলোনোস্কোপি বা ম্যামোগ্রামের (নারীদের জন্য) পরামর্শ দেওয়া হয়।
এখন যদি আপনার কাগজে-কলমে বয়স ৪১ বছর হয়, তবে আপনার চিকিৎসক তো ওইসব পরীক্ষার পরামর্শই দেবেন না। এর অর্থ হলো আপনি যদি স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সময় আপনার বয়স নিয়ে সৎ না হন, তবে আপনি গুরুত্বপূর্ণ জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
আইনি অধিকার
কাগজে সঠিক বয়স না থাকার কারণে অন্যান্য চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়।
যেমন: আপনাকে প্রথম ভোট দিতে বা ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে তুলনামূলক বেশি অপেক্ষা করতে হবে। এ ছাড়াও, আপনার দাপ্তরিক বয়স অনুযায়ী যদি নাবালক হন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে চুক্তি সই করতে বা নিজের আর্থিক কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও আপনি নিতে পারবেন না।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাস করেন নাসির উদ্দিন আহমেদ (৬২)। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, তিনি সিনিয়র কার্ডের যোগ্য। যে কার্ড ব্যবহার করে প্রবীণরা রেস্তোরাঁ, খুচরা দোকান এবং গণপরিবহনে ছাড় ও সুবিধা নিতে পারেন। তবে তিনি কার্ডটি সংগ্রহ করতে পারছেন না। কারণ সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার বসয় ৫৮ বছর।
মানুষ তাদের বয়স সম্পর্কে সত্য না বললে অনেক সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়।
আসলে যে দেশে জন্মসনদ জাল করা যায়, জন্মতারিখ পরিবর্তন করা যায় এবং যেখানে নিজের জন্মতারিখ নিয়ে মিথ্যা বলা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য, সেখানে অন্যান্য বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলাটাও ঠিক ততটাই সহজ। আর সেটাই আমাদের দেশে হয়েছে।
জন্মতারিখ নিয়ে মিথ্যা বলা এমন একটি বিষয়, যা আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি এবং আমৃত্যু চালিয়ে যাই। এভাবে, আমাদের মৃত্যুসনদেও একটি ভুল জন্মতারিখ লেখা থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি দুঃখজনক বিষয়।
অনুবাদ করেছেন জ্যোতি রশীদ


Comments