মাচাদো নাকি রদ্রিগেজ, ট্রাম্পের চালে কে হারাবে কাকে?

ডেলসি রদ্রিগেজ ও মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আটক করার পর দেশজুড়ে চরম বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরের মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারছে না—আসলে এখন তাদের দেশ কে চালাচ্ছে? আর ক্ষমতায়ই বা কে আছেন?

ভেনেজুয়েলাবাসীর এসব প্রশ্নের নানা ব্যাখ্যা আসছে ট্রাম্প প্রশাসন, মাদুরো সমর্থক ও বিরোধীদের কাছ থেকে। নিজ নিজ পক্ষে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

বার্তাসংস্থা এপির প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যা বলছে

নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলা চালাবে, এর আইনি ভিত্তি কী হবে, কিংবা সেখানে মার্কিন সামরিক বা বেসামরিক কর্মী মোতায়েন করা হবে কি না—এ বিষয়গুলো স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। মন্তব্য করেনি মার্কিন পররাষ্ট্রদপ্তরও।

তবে ভেনেজেুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতার উত্তরাধিকারী এখন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।

ইতোমধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত তাকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও রদ্রিগেজকে সমর্থন দিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার একটি নতুন অধ্যায় শুরুর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক রদ্রিগেজ।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে রদ্রিগেজের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেন, 'তিনি (রদ্রিগেজ) বলেছেন, "আপনারা যা চান, আমরা তাই করব"। আমি মনে করি, তিনি যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন। আমরা বিষয়টিকে সঠিকভাবে সামলাব।'

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের এ মন্তব্য অনেক বিশ্লেষককে অবাক করেছে। তারা মনে করেন, রদ্রিগেজের যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

রদ্রিগেজ নিয়ে বিতর্ক

গতকাল শনিবার বিকেলে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ডেলসি রদ্রিগেজ টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, 'এই দেশে একজনই প্রেসিডেন্ট আছেন, আর তার নাম নিকোলাস মাদুরো।'

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের মুক্তি দাবি করেন এবং একে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন।

দায়িত্ব নিলেও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার শপথ অনুষ্ঠানের সম্প্রচার দেখা যায়নি।

তিনি একইসঙ্গে অর্থ ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করলেও রদ্রিগেজের ভূমিকা এবং তিনি আসলে কোন পক্ষে কাজ করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এপির বিশ্লেষণে বলা হয়, ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে রদ্রিগেজ ও তার ভাই জর্জ রদ্রিগেজের।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে আইন নিয়ে পড়াশোনা করা ডেলসি রদ্রিগেজ হুগো শ্যাভেজের সময় থেকে মাদুরো পর্যন্ত একটানা সরকারে ছিলেন। 

মাদুরোর অভ্যন্তরীণ বৃত্তের অনেকের বিপরীতে, রদ্রিগেজে ভাইবোনেরা বারবারই ফৌজদারি অভিযোগ এড়িয়ে গেছেন।

তেল শিল্প ও ওয়াল স্ট্রিটে মার্কিন রিপাবলিকানদের সঙ্গে তার দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছে এপি।

অতীতে রদ্রিগেজের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ছিলেন—ব্ল্যাকওয়াটারের প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স এবং ট্রাম্পের এবারের বিশেষ দূত রিচার্ড গ্রেনেল।

সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের অবস্থান

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ ভিডিও বার্তায় বলেন, 'আমাদের ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু তারা আমাদের ভাঙতে পারবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো ক্যাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার ডাকে সাড়া দিয়ে কিছু এলাকায় লোকজন জড়ো হয়ে সমাবেশ করেছে এবং মার্কিন পতাকাও পোড়ায়।

তবে এপি বলছে, ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ মানুষ ভয়ে ঘরের ভেতরেই ছিল।

কারাকাসের বাসিন্দা ইয়ানিরে লুকাস এপিকে বলেন, 'আমরা আতঙ্কিত, কী করব বুঝতে পারছি না।'

মাচাদো ও বিরোধী দল যা বলছে

২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো তার মিত্রদের নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চান।

গত বছর ধরে বেশিরভাগ সময় আত্মগোপনে ছিলেন বিরোধী নেতা মাচাদো। শনিবার রাতে মার্কিন অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী আটক হওয়ার পর তিনি বলেন, 'মাদুরো ভেনেজুয়েলা এবং অন্যান্য অনেক দেশের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত নৃশংস অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হবেন।'

ইতোমধ্যে তিনি বলেছেন, ২০২৪ এর নির্বাচনে প্রকৃত জয়ী হয়েছেন বিরোধী দলীয় প্রার্থী এডমুন্ডো গনজালেস। তাকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত বলে জোরালো দাবি তুলেছেন মাচাদো।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে মাচাদো-গনজালেসকে সমর্থন, এমনকি গনজালেসকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এখন তার ভিন্ন চেহারা স্পষ্ট।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, 'মাচাদোর পক্ষে দেশ চালানো খুব কঠিন হবে। তার দেশের ভেতরে যথেষ্ট সমর্থন বা সম্মান নেই।'

রাজনৈতিক রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ

ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত থাকলে এক মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন হওয়ার কথা।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিধান কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে—বিশেষ করে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সামরিক বাহিনীর ঐক্য ও শক্তির ওপর।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়লে পরিস্থিতি আরও অস্থির ও সংঘাতের দিকে যাবে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

Comments

The Daily Star  | English
mob violence in South Asia

Why mob violence is rising across South Asia

In South Asia, the mob has evolved into a calculated tool for political mobilisation and social policing.

9h ago