দৈনিক কতটুকু চা-কফি খাওয়া ক্ষতিকর না
পানীয় হিসেবে চা কিংবা কফি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বন্ধুদের আড্ডা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আলোচনার টেবিল—সব জায়গাতেই এর সমান কদর।
চা, কফি খাওয়ার ক্ষতিকর ও উপকারী দিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।
চা, কফি খাওয়া কি ক্ষতিকর?
চা-কফি খাওয়া শরীরের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর, এর জবাবে ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, পরিমিত মাত্রায় চা-কফিতে ক্ষতির কোনো আশঙ্কাই নেই। আমাদের শরীরের কোষের ক্ষতি করে যে সমস্ত ফ্রি রেডিক্যাল, সেই সেলগুলোকে রক্ষা করে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। চা-কফিতে রয়েছে ক্যাফেইন আর পলিফেনল নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। কিছুদিন আগেও আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, চা-কফি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ১ থেকে ২ কাপ কফি কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের আশঙ্কা অনেকটাই কমাতে পারে।
অত্যধিক মাত্রায় চা-কফি খাওয়া শরীরের পক্ষে অবশ্যই ক্ষতিকর। কিন্তু এগুলোর পরিমিত মাত্রা স্বাস্থ্যের উন্নতিই করে।
চা বেশ কয়েক রকম হয়ে থাকে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের ওয়েবসাইট পাঁচ ধরনের চায়ের কথা উল্লেখ আছে—ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি, ওলং টি, ইনস্ট্যান্ট টি এবং সাদা টি।
কালো চা: এটি সম্পূর্ণভাবে জারিত (অক্সিডাইজড) করা হয়। যার ফলে এর স্বাদ গাঢ় ও সমৃদ্ধ হয়।
সবুজ চা: এটি খুব কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার ফলে এর স্বাদ হালকা ও সতেজ থাকে।
ওলং চা: এটি কালো ও সবুজ চায়ের মাঝামাঝি একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ ধাপ অনুসরণ করে। এর মধ্যে আংশিকভাবে জারণ ঘটে।
সাদা চা: এটি সবচেয়ে কম প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং সাধারণত কচি কুঁড়ি ও পাতা দিয়ে তৈরি হয়।
ইনস্ট্যান্ট চা: ইনস্ট্যান্ট চা এই মুহূর্তে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই চা-গুলো প্রায়ই বিভিন্ন ফ্লেভার, যেমন: ভ্যানিলা, মধু, বা ফল কখনো কখনো গুঁড়ো দুধসহ আসে।
চা-প্রেমীরা এই ধরনের পণ্যগুলোর সমালোচনা করে থাকে। কারণ তাদের মতে, সুবিধার জন্য চায়ের আসল স্বাদ ও সূক্ষ্মতা নষ্ট হয়।
চায়ের উপকারিতা
চা খেলে শরীরের ক্ষতি হবে, গায়ের রং কালো হয়ে যাবে, লিভার খারাপ হবে, দাঁত নষ্ট হবে—এসব কথার তেমন ভিত্তি নেই। সাম্প্রতিক গবেষণা চা নিয়ে অত-শত কথা চায়ের ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিয়েছে। তবে খালি পেটে চা খেলে অনেকের ক্ষেত্রে গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।
আসলে চা আমাদের শরীরের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। গবেষকরা বলেছেন, চায়ে থাকে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। মূলত এর আসল নাম অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পলিফেনল। বিট, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, আলু, টমেটো আর শসায় প্রচুর পরিমাণে থাকে যৌগটি। তবে সমস্যা হলো, সাধারণ অন্য শাক-সবজিতে এর পরিমাণ বেশ-কম থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে যতটা প্রয়োজন, তা মেটে না এতে। চা'য়ে কিন্তু এটি অনেক বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়। আর গ্রিন টিতে এ অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। তবে সাধারণ কালো চা-ও খুব পিছিয়ে নেই। আর এ অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ এককথায় হচ্ছে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো।
১. অতিরিক্ত স্ট্রেস বা মানসিক ও শারীরিক চাপ থেকে ফ্রি রেডিক্যালস জন্মায়। চা'য়ে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সতেজ রাখে।
২. ক্যানসার প্রতিরোধেও সাহায্য করে চা। এর পলিফেনলের অ্যান্টি-ক্যানসার ভূমিকা আছে।
৩. চায়ে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে। শরীরের, বিশেষ করে দাঁতের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্যালসিয়াম খুব উপকারী। আগে মনে করা হতো, চা খেয়ে ভালো করে দাঁত না ধুলে মুখে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু দেখা গেছে মূল সমস্যা চা না, মূল সমস্যা হলো চায়ের চিনি। কারণ চিনির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি। ফলে ওজন বৃদ্ধি পায় আর মুখে রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৪. এ ছাড়া ধূমপানের ফলে শরীরে সৃষ্ট ফ্রি রেডিক্যালস নষ্ট হয় চায়ের গুণে।
৫. গ্রিন টি-তে রয়েছে থিয়ানিন, ক্যাফেইন, ভিটামিন এ, বি, সি, ই, পলিফিনল এবং মিনারেলস। ভিটামিন 'এ' দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে, থায়ামিন (ভিটামিন 'বি') ত্বক ভালো রাখে, জড়তা কাটাতে, কোলেস্টেরল কমাতে ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
৬. শরীরের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হলো পটাশিয়াম। পটাশিয়াম ক্লান্তি, অবসাদ দূর করে শরীরকে চাঙা করে রাখে। প্রতিদিন ৪-৫ কাপ গ্রিন টি পটাশিয়ামের তিন চতুর্থাংশ পূরণ করে দেয়।
৭. চায়ে সামান্য পরিমাণে জিঙ্ক রয়েছে, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
৮. এ ছাড়া ৫-৬ কাপ লিকার চা পান করলে ম্যাঙ্গানিজের অর্ধেক চাহিদা পূরণ হয়।
অতিরিক্ত চা, কফি খাওয়ার কারণে কি ক্ষতি হতে পারে?
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, এক কাপ কফিতে সাধারণত ৮০-১৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। আর সাধারণ চায়ে ৩০-১০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে।
১. দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত গ্রহণ করলে স্নায়ু উত্তেজক হিসেবে কাজ করে উদ্বেগ, অস্থিরতা এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, বিশেষত রাতে পান করলে।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন প্যানিক অ্যাটাকও করতে পারে।
৩. অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে হৃৎস্পন্দন এবং রক্তচাপ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অতিরিক্ত চা-কফি পরিহার করা উচিত। বিশেষত যারা হৃৎস্পন্দনের সমস্যার রোগী তাদের ক্ষেত্রে চা-কফি পরিহার করতে হবে।
৪. খালি পেটে চা বা কফি খেলে পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন বাড়তে পারে, ফলে বুকজ্বালা এবং হজমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এমনকি দাঁতে দাগ ফেলতে পারে এবং দাঁতের এনামেলকে নষ্ট করে।
৫. চা-তে থাকা থিওফাইলিন কোষ্ঠকাঠিন্য সৃষ্টি করে।
৬. এ ছাড়া কফির কারণে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ বা এটি হ্যালিটোসিসের কারণ হতে পারে। কারণ, এটি জিহ্বায় লেগে থাকে।
৭. চা ও কফিতে ট্যানিন নামক পদার্থ থাকে, যা দাঁতের এনামেলকে দাগ বা বিবর্ণ করতে পারে। অবশ্য চায়ে ফ্লোরাইডও থাকে, যা দাঁতের এনামেলকে মজবুত করে এবং দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করে।


Comments