কেন ‘সরি’ বলা জরুরি
সম্পর্ক যতই মধুর হোক না কেন, মনোমালিন্যের কিছুটা তিতকুটে ভাব আমাদের একটা না একটা সময় ঘিরে ধরেই। আর তা থেকে বেরিয়ে আবারও মিষ্টি আমেজ ফিরিয়ে আনতে হলে জাদুর মতো কাজ করে একটি শব্দ— 'সরি'!
তবে কি নিজের ভুল না থাকলেও সরি বলবেন? না এমনটা নিশ্চয়ই করা ঠিক হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে।
দোষ কি আপনার?
একেবারে শুরু থেকে শুরু করা যাক। ধরা যাক, আপনার কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়েছেন। এমতাবস্থায় সাধারণ চোখে, সরি আপনার বলা উচিত। কিন্তু কাজটি কী ছিল, আপনি কাজটি করার মাধ্যমে কি তাকে আসলেই কষ্ট দিতে চেয়েছেন—নাকি আপনার উদ্দেশ্য সৎ ছিল, বরং অপরপক্ষই বিষয়টিকে ভুলভাবে গ্রহণ করেছে? এমন বহু প্রশ্নের পুলসিরাত পেরিয়েই জানতে হবে, দোষ কি আপনার ছিল? যদি নির্দ্বিধায় মনের মধ্যে উত্তর আসে 'হ্যাঁ', তবে আজই একটি চিরকুটে লিখে ফেলুন পৃথিবীর মানবিক শান্তিচুক্তির একটি ছোট্ট কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ—সরি!
দোষ যদি আপনার নাও হয়
অনেক ক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে কেউ আপনার কোনো আচরণকে ধরে নিয়ে কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু দোষটা আপনার নয়। এমন সব ক্ষেত্রে যদি আপনি বিষয়টি জানতে পারেন, তাহলে ব্যক্তিটির সঙ্গে মুখোমুখি বসুন, আলাপ করুন। তাকে বুঝিয়ে বলুন, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও আপনার অবস্থান। এক্ষেত্রে সোজাসুজি সরি বলে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি থাকবে না ঠিকই, কিন্তু আপনি তাকে অন্তত এটুকু বোঝাতে পারেন যে আপনি তার কষ্টটা বুঝতে পারছেন।
ভুলের মাত্রা
সব ভুল ভুল নয়, আবার সব ভুলের মাত্রাও এক নয়। ভুল করে করা ভুলগুলোকে যত সহজে মেনে নেওয়া যায়, ঠিক সেভাবে কিন্তু জেনেবুঝে করা ভুলগুলোকে নেওয়া যায় না। আর তাই ভুলের মাত্রা বুঝে দুঃখ প্রকাশ এবং সেইসঙ্গে পরবর্তীতে কীভাবে আপনি বিষয়টিকে প্রতিরোধ করবেন, এর ওপরও জোর দেওয়া দরকার।
মনে রাখতে হবে, 'সরি' কোনো জাদুর ছড়ি নয় যা ঘোরালেই আপনার সব ধরনের কাজ ন্যায্যতা পেয়ে যাবে। সম্পর্কের গভীরতা বুঝে, অন্যের প্রতি আপনার যেকোনো অযাচিত আচরণের মাত্রা পরিমাপ করে যথাযথ উপায়ে সরি বলতে হবে।
আপনি কি বুঝে সরি বলছেন?
অনেক সময় এমনটা হয় যে সরি বলার পরও অপর পক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য দূর হয় না, বরং অদ্ভুত এক নীরবতায় ছেয়ে যায়। তখন হয়তো যিনি সরি বলছেন, তিনি দ্বিধায় পড়ে যান। এ ধরনের পরিস্থিতি জন্ম নেওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে, কেন দুঃখ প্রকাশ করা হচ্ছে বা কীসের জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, সেটি নিজের মধ্যে বোধ না করে শুধু নামকাওয়াস্তে সরি বলা। এর ফলে যা হয়, তা হচ্ছে—অপরপক্ষের মনে হয়, আপনি বিষয়টিকে অত্যন্ত হালকাভাবে নিচ্ছেন এবং আদতে আপনি চানই না বিষয়টি ঠিক হোক। আর এভাবেই বাড়তে থাকে অনুযোগের পাল্লা।
তাই শুধু সরি বলা নয়, মন থেকে তা অনুভব করে এরপর পর্যাপ্ত ব্যাখ্যাসহ বা ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাখ্যা ছাড়া উপস্থাপন করুন নিজেকে।
সরি বলা কি খুব কঠিন?
এমন প্রশ্নও অনেকের মাঝে ঘুরেফিরে নিশ্চয়ই। শুনতে অবাক লাগলেও, এই ক্ষমা চাওয়া-ক্ষমা করা নিয়েও কিন্তু গবেষণার পর গবেষণা হয়েছে, ভেবে ভেবে মাথার জটিল প্যাঁচ আরও জটিল করে তুলেছেন বহু গবেষক। এমনই একজন হলেন লিজা লিওপল্ড।
তিনি বলেন, 'ক্ষমা চাইতে হলে মানুষকে অনেক বেশি বিনয়ী হতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে মনে হতে পারে—মাথা নত করতে হচ্ছে। তবে এটি খুব জরুরি একটি বিষয়। ১৭৫টি গবেষণার মেটা-অ্যানালাইসিস থেকে দেখা গেছে, ক্ষমার ক্ষেত্রে সরি বলাটা বেশ প্রভাব রাখে। একইসঙ্গে নিজেদের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি, মানসিক চাপ কমার মতো বাড়তি পাওয়া তো রয়েছেই। মানবিক সম্পর্কও আরও জোরদার হয়।'
তাই, নিজেকে ও নিজের আশপাশের মানুষগুলোকে ভালো রাখতে অহমবোধের দরজায় একটুখানি তালা মেরে দিন আর নতুন বছরে নতুন করে সরি বলতে শিখুন। কেননা যতই বাংলা সিনেমার সংলাপে বারবার বলা হোক, 'সরি বললেই সব ঠিক হয়ে যায় না'—একথাও সত্যি যে সরি বললে অনেক কিছুই ঠিক হয়ে যেতে পারে। অন্তত ঠিক হওয়ার সম্ভাবনাটা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


Comments