খালেদা জিয়াকে নিয়ে নির্বাচিত ১০ বই

খালেদা জিয়া—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অপরিহার্য নাম। তিনি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে মানুষের মনে জায়গা অর্জন করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। একজন গৃহিণী থেকে স্বামী হারানোর দগদগে ব্যথা নিয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাঠখড় পুড়িয়ে হয়ে ওঠেন পরিণত রাজনীতিক। দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পিছনে সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিও তিনি।

খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ স্মরণে রাখবে বিশেষত গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন ও দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য।‌

তার রাজনৈতিক দর্শন, নানান পট পরিক্রমায় তার দুর্দমনীয় অবস্থান, ব্যক্তিজীবন ইত্যকার বিভিন্ন বিষয়ে নানান সময়ে লেখা হয়েছে অনেক বই। তার আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন, তৎকালীন ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা সম্পর্কে জানতে বইগুলো সম্যক ভূমিকা রাখবে।

এখানে নির্বাচিত ১০টি বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা হলো:

১. বেগম খালেদা জিয়া জীবন ও সংগ্রাম, লেখক: মাহফুজ উল্লাহ

২০২৪ সালে ইতি প্রকাশন বইটি প্রকাশ করে। একই লেখকের Begum Khaleda Zia: Her life, Her History নামে ইংরেজি ভার্সনও পাওয়া যায়। খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর লেখা বইটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, নারী শিক্ষা, ভৌত-অবকাঠামো নির্মাণে খালেদা জিয়ার অবদান এবং সর্বোপরি দেশ পরিচালনায় তার দক্ষতা ও সংগ্রামী জীবন সম্বন্ধে জানতে বইটি অবশ্য পাঠ্য।

২. খালেদা, লেখক: মহিউদ্দিন আহমদ

২০২৪ সালে অনন্যা প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করে। খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে লেখা যায় উপন্যাস, কিন্তু অনিবার্যভাবেই সেখানে রাজনীতি আসবে। এখানেই জটিলতা—একপক্ষের কাছে বন্দনা তো অন্যপক্ষের কাছে সমালোচনা। তাছাড়া তথ্যের প্রশ্নেও আসে আরও চাপ। লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কেউ না কেউ জানতে চান, এই তথ্যের উৎস কী? অর্থাৎ, প্রতিটি বক্তব্যের নির্ভুলতা প্রমাণ করা যেন অপরিহার্য দায়িত্ব। কল্পনা বা মনগড়া গল্পের সুযোগ সেখানে সীমিত।

এই বাস্তবতায় আত্মরক্ষার পথ হিসেবে তাই লেখক বেছে নিয়েছেন এক ধরনের রেফারেন্স-নির্ভর লেখা। ফলত এটি আর নিছক উপন্যাস নয়; হয়ে ওঠে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের একটি দলিলভিত্তিক আখ্যান। যেখানে কল্পনার চেয়ে তথ্যই মুখ্য, আর আবেগের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা।

৩. গণতন্ত্রের আপোসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, লেখক: হায়দার আকবর রনক

২০২৫ সালে মুক্তদেশ প্রকাশন বইটি প্রকাশ করে। এতে বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে এবং জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে যোগদান, সেইসঙ্গে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাসনামল, বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন সময়ের কথা ও সর্বশেষ শেখ হাসিনার আমলে জেল-জরিমানাসহ অসুস্থ জীবনের নানান ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছে।

৪. খালেদা জিয়া তৃতীয় বিশ্বের কণ্ঠস্বর, লেখক: এমাজউদ্দীন আহমদ ও আবদুল হাই শিকদার

২০১৯ সালে হাতেখড়ি প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তার রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম, নানা চড়াই-উতরাই, রাজনীতিতে পদার্পণ এবং বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতিতে তার ভূমিকা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

৮৬০ পৃষ্ঠার ভলিউম হিসেবে, এটি শুধুই সংক্ষিপ্ত জীবনী নয়, বরং একটি ব্যাপক রাজনীতির বিশ্লেষণ, সময়ের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ব্যক্তিসংক্রান্ত নানা প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত।

৫. বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়া, লেখক: কাউছার ইকবাল

২০০৩ সালে হাসি প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৯ বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আপসহীন সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে অবশেষে জনগণের আন্দোলন সফল হওয়ার পর জনগণের রায়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করেন।

খালেদা জিয়ার স্বৈরাচারী এরশাদ ও হাসিনাবিরোধী সংগ্রামের চিত্র এ গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। বইটি পড়লে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে খালেদা জিয়ার অবদান কত ব্যাপক ছিল।

৬. জিয়া থেকে খালেদা অতঃপর, লেখক: শরিফুল হক ডালিম (বীর উত্তম)

২০২৫ সালে আদর্শলিপি থেকে প্রকাশ হয় বইটি। এতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচিতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম, স্বাধীনতা উত্তরকালে আওয়ামী-বাকশালী একদলীয় স্বৈরশাসনের পতনের লক্ষে ১৫ আগস্ট বিপ্লব, ২-৩ নভেম্বর খালেদ-চক্রের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যর্থ ক্যু এবং ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে সেনা পরিষদের অবদান, পরবর্তী পর্যায় বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাবলি উঠে এসেছে।

৭. জেল থেকে বলছি, লেখক: শামীম আনসারী

সাহিত্যদেশ প্রকাশনী থেকে ২০২৫ সালে ছড়ার বইটি প্রকাশিত হয়।‌ সামগ্রিক অর্থে বেগম খালেদা জিয়া সমকালীন ইতিহাসে মহান ও বরেণ্য ব্যক্তি। কিন্তু প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতিহিংসার শিকার হন তিনি। সাজানো মামলায় কারাগারে বন্দি হন খালেদা জিয়া। এক দুঃসহ ও নজিরবিহীন পরিবেশে তিনি জীবন যাপন করছেন সেখানে।

এ প্রেক্ষাপটে তিনি কেমন আছেন এবং তার জেল জীবনের কষ্টকর অনুভূতি কী—এসব নিয়েই ছড়াকার শামীম আনসারী লিখেছেন 'জেল থেকে বলছি'।

এ ছাড়াও সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক অবক্ষয়, দুঃশাসন, অনিয়ম, অবিচারসহ নানা সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে লেখাও ছড়ার বইতে স্থান পেয়েছে। সমাজ সচেতনতামূলক ছড়ায় তিনি তুলে ধরেছেন বাস্তবভিত্তিক চিত্র।

৮. গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, লেখক: আবুল কাসেম হায়দার

২০২৫ সালে লেখালেখি প্রকাশনা থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, বিশেষ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে লেখা একটি প্রবন্ধ বা লেখা। যেখানে বাংলাদেশে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা ও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকা (১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-২০০৬) এবং সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা।

লেখক এখানে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, বিশেষত গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ভূমিকা এবং 'গণতন্ত্রের নেত্রী' হিসেবে তার পরিচিতি নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

৯. রাষ্ট্র ভাবনায় খালেদা জিয়া, লেখক: অধ্যাপক ড. মু. নজরুল ইসলাম তামিজী

জুই জেমী প্রকাশনী ২০২৫ সালে বইটি প্রকাশ করে।‌ বইটিতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার রাষ্ট্র ধারণা, রাজনৈতিক দর্শন এবং বাংলাদেশে তার ভূমিকাকে।‌ বইটি শুধু জীবনী নয়, এটি এমন এক গ্রন্থ যা পাঠককে পরিচিত করে যে খালেদা জিয়া কেন, কোথায় ও কীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসনের ধারাকে প্রভাবিত করেছেন তার দূরদর্শিতার মাধ্যমে।

১০. জননন্দিত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, লেখক: ড. কে. এ. এম. শাহাদত হোসেন মণ্ডল

শিকড় প্রকাশনী থেকে ২০১৬ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। বটিতে লেখক বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যও স্থান পেয়েছে।

দেশের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, বাণিজ্য, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযোজনে (ত্রয়োদশ সংশোধন আইন, ১৯৯৬) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ভূমিকাসহ এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর বিশদ বর্ণনা করেছেন।


সুমন রেজা লেখক ও সাংবাদিক

Comments