ক্ষুধার স্মৃতি—সৈয়দ শামসুল হকের 'জলেশ্বরী'
সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য, বিস্তার ও নিরন্তর অভিযাত্রায় সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫–২০১৬) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত নাম। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, অনুবাদ ও প্রবন্ধ—সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তিনি রেখেছেন মৌলিক ও শক্তিশালী স্বাক্ষর। তবে তার সাহিত্যসাধনার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হলো ছোটগল্প। শতাধিক ছোটগল্পে তিনি যে জীবন, সমাজ ও সময়কে ধারণ করেছেন, তা বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে একটি বিশাল ও বহুমাত্রিক ভুবন নির্মাণ করেছে।
এই বিপুল গল্পভাণ্ডারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গ্রামবাংলা—বিশেষ করে তার কল্পিত জনপদ জলেশ্বরী। সৈয়দ শামসুল হকের গ্রামচিত্র কেবল নস্টালজিয়ামাখা স্মৃতির পুনর্নির্মাণ নয়; বরং তা ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক জটিল মানবভূগোল। তিনি গ্রামকে দেখেছেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা এক প্রান্তিক বাস্তবতা হিসেবে, যেখানে মানুষের জীবন সংগ্রামমুখর, অথচ গভীরভাবে মানবিক।
শৈশব ও কৈশোরে যে অঞ্চলে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, তা নামেমাত্র মহকুমা শহর—বাস্তবে ছিল গ্রামেরই সামান্য উন্নত সম্প্রসারণ। ফলে শহর ও গ্রামের যে দ্বৈত অভিজ্ঞতা, তা তার মানসজগতে এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতারই শিল্পিত রূপ আমরা পাই জলেশ্বরীর গল্পগুলোতে। উন্নয়নের ছোঁয়াবিহীন, দারিদ্র্য ও অভাবঘেরা সেই জনপদে মানুষের জীবন ছিল ক্ষুধা, রোগ, কুসংস্কার ও বঞ্চনায় জর্জরিত। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও সৈয়দ হক খুঁজে পেয়েছেন মানুষের অন্তর্গত শক্তি, সংকটের মধ্যে জন্ম নেওয়া নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অনমনীয় প্রবণতা।
গ্রামভিত্তিক ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়। তবু এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ভেতর থেকেও সৈয়দ শামসুল হককে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। কারণ তিনি গ্রামকে শুধু পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি; গ্রাম নিজেই তার গল্পের এক সক্রিয় চরিত্র। বিশেষত জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৮৯; পরিমার্জিত ও সম্প্রসারিত সংস্করণ ২০০৮) বাংলা ছোটগল্পে আঙ্গিক ও বয়ানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
জলেশ্বরী—বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই—আসলে কুড়িগ্রামকে আদল করে গড়ে ওঠা একটি কল্পিত জনপদ। মান্দারবাড়ি, ভেলাকোপা, শকুনমারী, বুড়ির চর, কাঁঠালবাড়ি, হাওয়ার হাট, উলিপুর, বল্লার চর, রাজার হাট—এমন অসংখ্য স্থাননাম জলেশ্বরীকে ঘিরে তৈরি করেছে এক বিস্তৃত ভৌগোলিক মানচিত্র। এই মানচিত্র বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য। পরিচিত বাস্তবতার ভেতরে তিনি এনেছেন অচেনা এক সুর—যার মাধ্যমে পাঠকের মনে জন্ম নেয় কৌতূহল, রহস্যবোধ ও অনুসন্ধিৎসা।
বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু বড় কথাশিল্পী কল্পিত জনপদের আশ্রয় নিয়েছেন। উইলিয়াম ফকনারের ইয়কনাপাটফা, আর. কে. নারায়ণের মালগুড়ি, হুয়ান রুলফোর কোমালা কিংবা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মাকোন্দো—সবকটিই বাস্তবকে ছাপিয়ে যাওয়া কল্পিত ভূগোল। এই ধারাবাহিকতায় সৈয়দ শামসুল হকের জলেশ্বরীও এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। জলেশ্বরী নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে মৌলিকত্বের এক দৃঢ় দাবি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ সময়ের বহু লেখকের থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা হয়ে ওঠেন।
২
সৈয়দ শামসুল হকের গল্পরচনার মধ্যপর্ব (১৯৭০–২০০০) তার সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল অধ্যায়গুলোর একটি। এই সময়েই তার গল্পের আঙ্গিক, বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮১) এই পর্বের সূচনাপর্ব হলেও প্রকৃত বাঁকটি তৈরি হয় জলেশ্বরীর গল্পগুলো প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
এই পর্বে সৈয়দ হক শুধু নাগরিক জীবনের কথাকার নন, হয়ে ওঠেন 'জলেশ্বরীর কথাকার'। 'নাগরিক লেখক' অভিধা তাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। কারণ জলেশ্বরী শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের প্রতিরূপে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিণত হয় সমগ্র বাংলাদেশের এক প্রতীকী রূপে—যেখানে ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতা, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, ক্ষুধা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একত্রে কাজ করে।
এই সময়ের গল্পগুলোতে তিনি আঙ্গিক নিয়ে সচেতনভাবে নিরীক্ষা করেছেন। তবে তার নিরীক্ষা কখনও গল্পের মূল কাঠামো ভেঙে ফেলার দিকে যায়নি। তিনি কাহিনিহীন গল্প বা চরম ভাঙচুরে বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং গল্পকে অক্ষুণ্ন রেখে তার শরীরের ভেতরে পরিবর্তন এনেছেন। রূপক ও প্রতীক তার গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
জলেশ্বরীর গল্পে সবচেয়ে লক্ষণীয় কৌশল হলো 'আমরা' নামক সামূহিক বয়ানের ব্যবহার। এই সামূহিক কণ্ঠ লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গি ও জনপদের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে তৈরি করেছে একটি যৌথ চেতনা। এতে গল্পের বয়ান ব্যক্তিগত না থেকে সামাজিক হয়ে ওঠে। সংলাপ এখানে খুবই কম; বর্ণনা ও বিশ্লেষণই প্রধান। ফলে গল্পগুলো অনেক সময় 'গল্পপ্রবন্ধ' বা 'গল্পপট'-এর চরিত্র ধারণ করে।
এই পর্বে তিনি কিছু প্রতীক পরিকল্পিতভাবে বারবার ব্যবহার করেছেন—জলেশ্বরী নিজেই, মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন ও তার পুত্র শামসুদ্দিন, জ্যোৎস্না, আধকোষা নদী, শাহ সৈয়দ কুতুবুদ্দিনের মাজার, সৈয়দ আবদুস সুলতান কিংবা হানিফ ভাইয়ের হোটেল। এই পুনরাবৃত্ত প্রতীকগুলো জলেশ্বরীর জগৎকে করে তোলে সংহত ও স্মরণীয়।
৩
জলেশ্বরী একটি খরাপীড়িত অঞ্চল। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মতো এখানকার মানুষের জীবনও একসময় মঙ্গার অভিজ্ঞতায় বিধ্বস্ত ছিল। আশ্বিন-কার্তিকের কাজহীন সময়ে কৃষিশ্রমিকদের জীবনে নেমে আসত নীরব দুর্ভিক্ষ। মহাজন, জোতদার ও দাদনব্যবস্থার শোষণে তারা ক্রমেই হয়ে উঠত নিঃস্ব ও অসহায়। সৈয়দ শামসুল হকের বহু গল্পে এই বাস্তবতার নির্মম রূপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান গল্পে খরা ও ক্ষুধার যে রূঢ় চিত্র পাওয়া যায়, তা কেবল একটি গ্রাম নয়—বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার সার্বজনীন বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে। বুকের মধ্যে আশাবৃক্ষ গল্পে ক্ষুধার্ত যুবকের মানসিক ভাঙন, ধর্মীয় আশ্রয়ের ব্যর্থতা কিংবা সমাজের নিষ্ঠুর উদাসীনতা—সব মিলিয়ে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি নির্মিত হয়েছে।
৪
সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন এক নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী। তাই প্রথাগত গল্পবিচারের ছাঁচে তাকে সবসময় বিচার করা যায় না। বহু গল্পে দীর্ঘ ভূমিকা, অতিকথন কিংবা গৌরচন্দ্রিকা রয়েছে—যা প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিতে রীতিবহির্ভূত হলেও তার সৃষ্টিশীল অভিযাত্রারই অংশ। নতুনত্বের দায় তিনি কখনও এড়িয়ে যাননি।
গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতিকে তিনি তুলে এনেছেন গভীর মমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে। প্রথাকে ভাঙার এক নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয় তার জলেশ্বরী-পর্বে অবিচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত। এই নিষ্ঠাই বাংলা ছোটগল্পকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা—যা একান্তই সৈয়দ হকের।
সৈয়দ শামসুল হক তাই শুধু একজন শক্তিশালী গল্পকার নন; তিনি বাংলা সাহিত্যের ভূগোলে একটি আলাদা জনপদের স্রষ্টা। জলেশ্বরী তার সবচেয়ে বড় কীর্তি—যেখানে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, ইতিহাস ও সংস্কৃতি শিল্পিত রূপে স্থায়ী হয়ে আছে।


Comments