‘চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল’
চারজনের পরিবার নিয়ে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার পালকিছড়া চা বাগানে টিনের ঘরে থাকেন জন্মান্ধ রামনারায়ণ রবিদাস। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা করে কোনোরকমে দিন পার করতেন তিনি।
তবু রামনারায়ণ স্বপ্ন দেখেছিলেন—ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখবেন। ঋণ করে ছেলের জন্য অটোরিকশাও নিয়েছিলেন। কিন্তু চোর সেই জীবিকার্জনের উপায়টি কেড়ে নিয়েছে।
ছয় মাস আগে ঘরের জমানো শেষ সম্বল যোগ করে একটি অটোরিকশা কিনেছিলেন রামনারায়ণ রবিদাস। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালালে দু'মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। ভিক্ষাও আর করতে হবে না। কিন্তু গত মঙ্গলবার ভোরে ঘুম ভাঙতেই রামনারায়ণ জানতে পারেন, চোর তালা ভেঙে অটোরিকশা নিয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে রামনারায়ণের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রামনারায়ণের পরিবার যেন হেরে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি। শরীরে গরম কাপড় নেই, চোখে মুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব।
উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ণ বলেন, বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করে সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিকশাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু আল্লাহ আর সে সুখ দিলেন না।
এটুকু বলতেই তার কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে পানি পড়ে। পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাসও শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে থাকেন।
বাসমতি রানী জানান, এই অটোরিকশাটাই ছিল তাদের বিপদের ভরসা। এখন সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। তার ভাষায়, 'চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।'
রামনারায়ণের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা। তিনি বলেন, পুলিশকে জানাইয়া লাভ কী? এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনটার খবর মিলছে? আমারটা পাবে কীভাবে?
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সাত মাসে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। একটিও উদ্ধার হয়নি। চোরের সাহস বেড়েছে, আর মানুষের বেড়েছে ভয়।
এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত পরিতাপের। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রামনারায়ণের বাড়িতে পুলিশ খোঁজ নিতেও আসেনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গণেশ গোয়ালা বলেন, অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো নিভে গেছে চোরের কারণে।


Comments