‘ভাবলাম নিজের ধাঁচের আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলাই ভালো’
বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সৌম্য সরকারের এক আলাদা ধাঁচ আছে — সাম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে যা দেখা গেছে। মিরপুরের কঠিন উইকেটেও সৌম্য খেলেছেন ঝোড়ো ৯১ রানের ইনিংস। ৩২ বছর বয়সী এই ব্যাটার দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন তার ক্যারিয়ার, ওঠানামার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা, ব্যাটিং দর্শন এবং দলে তার পরিবর্তিত ভূমিকা নিয়ে।
মিরপুরে তৃতীয় ওয়ানডেতে কঠিন উইকেটে আপনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেছেন। রহস্যটা কী ছিল?
সৌম্য সরকার: তেমন কোনো রহস্য না, তবে ধীরে ধীরে আমার খেলায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। আফগানিস্তান বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিছু ইনিংস বড় করতে পারিনি, কিন্তু প্রক্রিয়াটা একই ছিল। (ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে) উইকেটটা বেশ কঠিন ছিল—প্রথম ম্যাচে দ্রুত আউট হয়ে যাই, দ্বিতীয় ম্যাচে ভেবেছিলাম শুরুতে টিকে থাকি, পরে পুষিয়ে দেব, উইকেট সেটি করতে দেয়নি। বুঝলাম, এমন উইকেটে যেকোনো সময় আউট হয়ে যেতে পারি, তাই শেষ ম্যাচে ভাবলাম নিজের আক্রমণাত্মক ধাঁচেই খেলাটা ভালো।
তবু আপনার শট নির্বাচনে কোনো দ্বিধা দেখা যায়নি
সৌম্য: যেহেতু উইকেট ভালো ছিল না এবং যে কোনো সময় আউট হতে পারতাম, তাই নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়েছে। বলের লাইন অনুযায়ী খেলেছি, ব্যাটিং নিয়ে বেশি ভাবিনি।
ফুটওয়ার্কে কি আলাদা কোনো জোর দিয়েছিলেন?
সৌম্য: না। প্রত্যেকের ফুটওয়ার্ক আলাদা। আমি কখনো নিজেরটা বদলানোর চেষ্টা করিনি। কারও বড় মুভমেন্ট থাকে, কারও ছোট। আমি বরং কাজের ধরণ, অনুশীলন আর মানসিক প্রস্তুতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি।
আপনি বললেন 'প্রক্রিয়া', কিন্তু সেটা তো সবার জন্য আলাদা। আপনার জন্য কোন প্রক্রিয়া ফল দিয়েছে?
সৌম্য: রানই শুধু আত্মবিশ্বাস এনে দেয়, আর কিছু না। কখনো ভালো উইকেটেও রান আসে না, কারণ আত্মবিশ্বাস কম থাকে, ফুটওয়ার্ক ঠিক থাকে না বা টাইমিং মেলে না। রান করলে ইতিবাচক ভাব আসে, যা অনেক সাহায্য করে।
ওয়ানডে আর ঘরোয়া ক্রিকেটে কি একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন?
সৌম্য: রান করলে পরের ম্যাচে আত্মবিশ্বাস আসে, কিন্তু প্রতিটা ইনিংসই নতুন শুরু। পরের দিন আবার প্রথম বলটা খেলতে হয়, তাই প্রতিবারই নতুন করে শুরু করতে হয়। ধারাবাহিক অনুশীলনই সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ায়।
আপনি তো অনেকবার দলে ঢুকেছেন, আবার বাদও পড়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রান করেও টি-টোয়েন্টি দলে ছিলেন না। আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা কতটা কঠিন?
সৌম্য: সবার জন্যই একই। সিনিয়র বা জুনিয়র—যে-ই হোক, দলে ফেরার পর আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছন্দে মানিয়ে নিতে হয়। শুরুটা ভালো হলে সহজ, না হলে বেশি ভাবনা চলে আসে। খেলোয়াড়দের নিজেদেরই এসব সামলাতে হয়।
আপনি কি মনে করেন, ইনিংসের প্রথম ১০ বলই পারফরম্যান্স নির্ধারণ করে দেয়?
সৌম্য: পুরোপুরি নয়। নিজের রুটিন মেনে চলাটাই আসল ব্যাপার। তাতেই সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ে, আত্মবিশ্বাসও আসে।
এখন আপনি এনসিএল খেলবেন। সাম্প্রতিক ওয়ানডে ফর্ম কতটা সহায়ক হবে?
সৌম্য: এনসিএলে গত কয়েক বছর ভালোই করছি। শেষ ম্যাচেও ভালো শুরু করেছিলাম, ৩৭ রানে ভালো বলেই আউট হয়েছি। চারদিনের ক্রিকেট আলাদা—রেড-বল খেলতে আলাদা অনুশীলন দরকার, কিন্তু সুযোগ সবসময় মেলে না। ওয়ানডে খেলে সরাসরি লাল বল খেলতে গেছি, যা কঠিন। মিরপুরেও একদিনের বেশি অনুশীলনের সুযোগ মেলে না। নিজের সময় বের করে নিতে হয়। যদি সেটা করতে পারি, টেস্ট ক্রিকেটেও আরও ভালো করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
সৌম্য : সবসময়ই টেস্ট খেলতে চেয়েছি। আগেও খুব খারাপ করিনি। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে স্পিন সহায়ক উইকেটে বড় ইনিংস সম্ভব হয়নি। তাতে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম। তবে এখন মনে হয়, অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে টেস্টে ভালো করার সুযোগও বাড়ে।
একসময় আপনি অলরাউন্ডার হিসেবে অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। আবার ওপেনিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন কেন?
সৌম্য: ওপেনার হিসেবে সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। এখনও বোলিং করি, কিন্তু নিয়মিত সুযোগ পাই না। সাধারণত কঠিন সময়েই বল হাতে পাই, যখন মূল বোলাররা সফল হচ্ছেন না। নিয়মিত বল করতে পারলে হয়তো অন্যভাবে জিনিসগুলো হতো।
ফুল-টাইম অলরাউন্ডার হতে না পারায় আফসোস আছে?
সৌম্য: তেমন না। আমি ব্যাটসম্যান হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। যখন অভিষেক হয়েছিল, তখন দল এক পেসার আর বেশি স্পিনার নিয়ে খেলত। এখন তিনজন পেসার খেলে, কিন্তু তখন পরিস্থিতি আলাদা ছিল।
তৃতীয় ওয়ানডেতে ভালো করার পরও টি-টোয়েন্টি দলে ছিলেন না—কেমন লেগেছে?
সৌম্য: কিছু না। আবার ডাক পেলে খেলব।
আপনি একবার বলেছিলেন, আপনার ব্যাচের খেলোয়াড়রা ১০ বছর পরও সিনিয়র হতে পারেনি। এখনো কি তাই মনে করেন?
সৌম্য : হ্যাঁ, আমি ১০ বছর খেলেছি, কিন্তু তখন তামিম ভাই, সাকিব ভাই ছিলেন। তাই আমাদের নাম সামনে আসেনি। তারা যখন ছিলেন, তখন জুনিয়ররা এসেছে। এখন আসলে দলে সিনিয়র-জুনিয়র বলে কিছু নেই। যদি তারা আগে অবসর নিতেন, হয়তো আমরা সিনিয়র হতাম। কিন্তু তারা খেলায় থাকাকালীন আমরা আসা-যাওয়া করছিলাম, তাই তখন ওই কথাটা বলেছিলাম।
এখন কি মনে হয়, দলে আপনার দায়িত্ব বেড়েছে?
সৌম্য : অবশ্যই। দলে ১১ জনেরই দায়িত্ব থাকে। আমি সবসময় সেই দায়িত্ববোধ নিয়ে খেলি।


Comments