পুরোনো অভ্যাসেই গেলো আরেকটি বছর, নতুন বছরে আবার নতুন আশা

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন, আগের মতোই মাঠে আরও একটি মিশ্র বছর পার করেছে। কখনো ক্ষণিক আশার আলো দেখা গেলেও মাঠের বাইরের কাঠামোগত স্থবিরতা শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। আসন্ন এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেওয়া নারী ফুটবল দলের অভাবনীয় সাফল্য ছাড়া দেশের ক্রীড়াচিত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার মতো তেমন কিছুই ঘটেনি।

নিঃসন্দেহে জাতীয় গর্ব উজ্জ্বল করা নারী ফুটবলারদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর, হামজা চৌধুরীর আগমনে ফুটবলকে ঘিরে নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, হকিতে দেখা গেছে আস্থার ক্ষীণ প্রত্যাবর্তন, আর ক্রিকেটে এসেছে মাঝেমধ্যে সাফল্যের ঝলক।

কিন্তু এসব ক্রীড়াকাহিনির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বেশি হতাশাজনক এক বাস্তবতা। নতুন বছরে পা রাখলেও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন আজও একই পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ।

জুলাই–আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর আলোকে যদি বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হতো, তবে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। সেই আন্দোলন ক্রীড়াসহ বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ক্রীড়াঙ্গন যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে সেই একই পুরোনো ও অচল চর্চা, যা বছরের পর বছর ধরে এর অগ্রগতিকে আটকে রেখেছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর যে গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর পরিচালনাকারী সংবিধানগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।

সিন্ডিকেট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের জবাবদিহির ঘাটতি, বাংলাদেশে ক্রীড়া উন্নয়নকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসা এসব অনাচারের কথাও তিনি অকপটে তুলে ধরেন।

তিনি স্বীকার করেন, দেশের অন্যান্য খাতে যে অবক্ষয় দৃশ্যমান, ক্রীড়াঙ্গনও তার বাইরে নয়। ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সংবিধান সংস্কারই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এমন আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু আরেকটি বছর শেষ হয়ে গেলেও সেই প্রয়োজনীয় সংস্কার রয়ে গেছে অধরাই। দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে প্রচুর, কিন্তু সত্য উদঘাটনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বা তদন্ত চোখে পড়েনি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার ধারাবাহিকতায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, সাঁতারসহ কয়েকটি ফেডারেশন বাদ দিয়ে অধিকাংশ জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনের সভাপতিকে অপসারণ করে।

একাধিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আত্মগোপনে চলে যান, যার ফলে সংস্থাগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ২৯ আগস্ট মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করে, যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০১৮ সালের এনএসসি আইনের আলোকে নির্বাহী কমিটি, সংবিধান, নির্বাচন নীতি ও প্রতিনিধিত্বে সংস্কারের সুপারিশ করা।

একাধিকবার সময়সীমা বাড়ানোর পর কমিটি নয় মাস ধরে কাজ করে, শতাধিক বৈঠক করে এবং তাদের দায়িত্বের প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন করে।

এই কমিটি ৫০টিরও বেশি ফেডারেশনের জন্য সংস্কারের সুপারিশ করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলো ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই, ২০২৫ সালের ২৪ জুন মন্ত্রণালয় আরও একটি কমিটি গঠন করে, যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় আইওসি চার্টারের আওতায় একটি মডেল সংবিধান প্রণয়ন এবং নীতিমালা পুনর্নির্ধারণ। অবশেষে সেই কমিটির সুপারিশ ডিসেম্বর মাসে জমা দেওয়া হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই, সংস্কার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অ্যাডহক কমিটিগুলোকে নির্বাচন প্রস্তুতির নির্দেশ দেয় এনএসসি, যা উদ্দেশ্য ও ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সংবিধান সংস্কারের বহু প্রতীক্ষিত উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। সরকারী হস্তক্ষেপের বাইরে থাকলেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বিসিবির নির্বাচনে যা ঘটেছে তা পুরোনো চর্চারই পুনরাবৃত্তি এবং উপদেষ্টার শুরুর দিকের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ছিল স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।

ডিসেম্বরে আসিফ মাহমুদ পদত্যাগ করার সময় দেখা যায়, ক্রীড়া প্রশাসন সংস্কারের দিক থেকে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের চেয়ে একচুলও এগোয়নি। সিদ্ধান্তহীনতা ও অর্ধেক পদক্ষেপের ভারে ক্রীড়াঙ্গন তখনও ছিল স্থবির।

এখন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশ যখন নতুন বছরে প্রবেশ করছে, তখন সবার দৃষ্টি থাকবে আসন্ন সরকারের দিকে। দীর্ঘদিন ধরে অপচয় হওয়া বিপুল সম্ভাবনার এই খাতে—ক্রীড়া প্রশাসনে—তারা আদৌ কি প্রকৃত সংস্কার আনতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এই মুহূর্তে আশাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু ইতিহাস যেমন বারবার দেখিয়েছে, শুধু আশা কখনোই যথেষ্ট নয়।

Comments

The Daily Star  | English

The magic of Khaleda Zia

Her last speeches call for a politics of ‘no vengeance’

23m ago