থাকতেন গ্যারেজে, কাজ করতে ড্রিলিং ফার্মে, তারপর হলেন বলিউড স্টার

ধর্মেন্দ্র । ছবি: সংগৃহীত

ধর্মেন্দ্র কেবল একটি নাম নয়। তিনি ছিলেন বলিউডের একটি অধ্যায়। আজ সেই অধ্যায়ের শেষ হলো। তবে শেষ হলেও সমাপ্তি হয়নি। কারণ তিনি বেঁচে থাকবেন ভক্তদের হৃদয়ে। ধর্মেন্দ্রের আগে ভারতের পর্দার তারকারা ছিলেন ট্র্যাজেডি হিরো। কিন্তু তিনি এসে সেই ধারা বদলে দেন। দর্শককে তার গ্রিক-দেবতার মতো চেহারায় তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেন। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন প্রভাব রেখে গেছেন, যা অন্য কোনো অভিনেতা খুব কমই পেরেছেন। তার মাধ্যমে সিনেমার একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছিল। ভক্তরা ভালোবেসে সেই ধারা নাম দিয়েছিল 'ধরম'।

ধর্মেন্দ্রের জন্য বহু বিশেষণ ব্যবহার করা হতো, যেমন গরম, নরম, গ্রিক দেবতা, দেশের ছেলে, পারিবারিক মানুষ ইত্যাদি। এভাবেই ছয় দশক ধরে চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। অভিনয় করেছেন ৩০০টির বেশি সিনেমাতে।

স্বপ্ন থেকে সত্যি

মুম্বাই এসে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হওয়ার গল্পটা ছিল স্বপ্নের মতো। পর্দার আইকন দিলীপ কুমার ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। পাঞ্জাবের একটি গ্রামের সাধারণ ছেলে ধর্মেন্দ্র দিলীপ কুমারকে দেখে অভিনেতা হওয়ার উৎসাহ পান। তরুণ ধর্মেন্দ্রের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন দিলীপ কুমার।

পরবর্তীতে তিনি তার আইডলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। একসময় এই আইডলই হয়ে ওঠেন বড় ভাইয়ের মতো। তরুণ ধর্মেন্দ্র গ্রামের মধ্যে সাইকেলে ঘুরে ঘুরে সিনেমার পোস্টার দেখতেন। দেখতেন সেখানে কোনো ছবির সঙ্গে তার মিল আছে কিনা। আর রাত জেগে চোখে স্বপ্ন নিয়ে ভাবতেন, কীভাবে বোম্বে হিয়ে বড় কিছু করবেন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'আমি বড় স্বপ্ন দেখতাম এবং সকালে আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, আমি কি দিলীপ কুমার হতে পারব?'

১৯৫৮ সালে ধর্মেন্দ্র ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন আয়োজিত ট্যালেন্ট কন্টেস্ট জেতেন। এই কন্টেস্টের বিজয়ীদের নতুন একটি সিনেমায় সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু ধর্মেন্দ্রর সেই সিনেমাটি কখনো মুক্তি পায়নি। দুই বছর পর তিনি বড় সুযোগ পান অর্জুন হিংগোরানির 'দিল ভি তেরা হুম ভি তেরে' সিনেমায়।

তরুণ ধর্মেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

শুরুর লড়াই

কিন্তু সিনেমার জগতে তার পথ সহজ ছিল না। প্রযোজকের অফিসে পৌঁছানোর জন্য অনেক দূর হাঁটতে হতো তাকে। আর্থিক সংকটও ছিল তখন।

তিনি একবার বলেছিলেন, 'শুরুতে মুম্বাইয়ে আমার বাড়ি ছিল না, তাই একটি গ্যারেজে থাকতাম। টিকে থাকার জন্য একটি ড্রিলিং ফার্মে কাজ করতাম। যেখানে আমার মাসিক বেতন ছিল ২০০ টাকা, আর অতিরিক্ত আয়ের জন্য ওভারটাইমও করতাম।'

১৯৬০ দশকে ধর্মেন্দ্র অনেক সাধারণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যেমন 'অনপাধ', 'বন্দিনী', 'অনুপমা' 'আয়া সাওয়ান ঝুম কে'। এরপর অ্যাকশন চলচ্চিত্রের মাচো-ম্যান নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। যেমন 'শোলে', 'ধর্ম বীর', 'ফুল অর পাথর', 'মেরা গাঁও মেরা দেশ' এবং 'সীতা অর গীতা'।

১৯৬৬ সালের 'ফুল অর পাথর' ছিল তার প্রথম বড় হিট। যেখানে তিনি দর্শকদের চমকে দিয়ে গায়ে শার্ট ছাড়াই একটি দৃশ্যে অভিনয় করেন। ওই দৃশ্যটি তার জন্য সমালোচনা ও প্রশংসা দুটোই এনে দেয়।

'আমি জানি না গ্রিক দেবতা মানে কী'

ধর্মেন্দ্রকে প্রায়ই গ্রিক দেবতার সঙ্গে তুলনা করা হতো। বিশেষ করে তার চেহারার জন্য। তবে একবার তিনি বলেছিলেন, তিনি আসলে 'গ্রিক দেবতা' কথাটির অর্থ জানতেন না। ধর্মেন্দ্রর পরে কেবল হৃত্বিক রোশনকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছে।

ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, 'আমি সব সময়ই আমার ইমেজ ভেঙেছি। বিশেষ করে প্রতিবার পর্দায় যাওয়ার সময়। আমি বিশ্বাস করি না যে, আমার কোনো ইমেজ আছে। আমি জানি না গ্রিক দেবতার মানে কী, তবে মানুষ আমাকে তা বলে ডাকত। মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে, আমি কখনো সেই ভালোবাসায় উচ্চাভিলাষী হইনি। ভালোবাসা আমাকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।'

হেমা মালিনীর সঙ্গে ধমেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

ড্রিম গার্লের প্রেমে পড়েছিলেন

অভিনয়ের পাশাপাশি ধর্মেন্দ্র ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকে হেমা মালিনীর সঙ্গে সম্পর্কের জন্য খবরের শিরোনামে ছিলেন। প্রায়ই হেমা মালিনী তার সহ-অভিনেত্রী থাকতেন। তারা তখন শোলে, সীতা অর গীতা এবং ড্রিম গার্ল সিনেমায় অভিনয় করেন। ওই সময়ে ধর্মেন্দ্র প্রকাশ কৌরের সঙ্গে বিবাহিত জীবনে ছিলেন। তাদের সন্তান সানি, ববি, অজিতা ও বিজেতা। ১৯৮০ সালে ধর্মেন্দ্র হেমা মালিনীকে বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা ঈশা ও অহনা।

ধর্মেন্দ্র কমেডি সিনেমাতেও অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। বিশেষ করে হৃষিকেশ মুখার্জী পরিচালিত চুপকে চুপকের কথা বলতেই হয়। ১৯৮০ দশকে অভিনয় দিয়ে তিনি নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন। তবে ১৯৯০-এর মাঝামাঝি ময়দান-ই-জং ও রিটার্ন অব জুয়েল থিফে মনমতো পারফরম্যান্সের অভাবে তার স্টারডম কিছুটা কমে যায়।

১৯৮৩ সালে ধর্মেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন নিজের প্রোডাকশন হাউস ভিজয়তা ফিল্মস, যেখানে তিনি তার ছেলে সানি দেওলকে বেতাব সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করান। বারো বছর পরে ছোট ছেলে ববি দেওলকে বরসাত সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করান।

ধর্মেন্দ্রের রাজনৈতিক যাত্রা

ধর্মেন্দ্রের ছোট রাজনৈতিক জীবনও ছিল। তিনি ২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত রাজস্থানের বিকানার থেকে বিজেপি পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০১২ সালে পদ্ম ভূষণ পুরস্কার পান ধর্মেন্দ্র।

ববি ও সানি দেওলের সঙ্গে ধর্মেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

পরিবারকে ভালোবাসতেন ধর্মেন্দ্র

২০২৩ সালে ধর্মেন্দ্র বড় পর্দায় ফেরেন রকি অর রাকি কি প্রেম কাহানী দিয়ে। তবে তার শেষ সিনেমাটিক উপস্থিতি হলো ইক্কিস, এটি আগামী ২৫ ডিসেম্বর মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই সিনেমাতে তিনি পুনরায় পরিচালক শ্রীরাম রাঘবনের সঙ্গে কাজ করেছেন।

পরিবারপ্রিয় ধর্মেন্দ্র সামাজিক মাধ্যমে তার স্বজনদের প্রশংসা করতেন। তিনি ববি দেওলের অ্যানিম্যাল সিনেমার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছে। চলতি বছর তার বেশিরভাগ পোস্ট ছিল সানি দেওল, ববি দেওল এবং দ্বিতীয় স্ত্রী হেমা মালিনীকে নিয়ে।

Comments

The Daily Star  | English
Khaleda Zia political legacy in Bangladesh

The magic of Khaleda Zia

Her last speeches call for a politics of ‘no vengeance’.

1d ago