২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই ১০ সিনেমা দেখেছেন?

২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই ১০ সিনেমা দেখেছেন?
ছবি: কোলাজ

সিনেমার জন্য ২০২৫ সালটি ছিল একেবারেই আলাদা। সুপারহিরো বা ফ্র্যাঞ্চাইজির ভিড় কমে এসে গল্প, চরিত্র আর মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব আবার বড় হয়ে উঠেছে। এই বছর নির্মাতারা বেশি মন দিয়েছেন অনুভূতির গভীরতায়, ইতিহাসের ছায়ায়, ব্যক্তিগত ক্ষত আর রাজনৈতিক অস্থিরতার নীরব চাপে।

এই ১০টি সিনেমা শুধু ভালো চলচ্চিত্রই নয়—এগুলো ২০২৫ সালের মানুষের ভাবনা, ভয়, ভালোবাসা আর অনিশ্চয়তার দলিল।

চলুন, একে একে দেখা যাক ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ১০ সিনেমা।

১. দ্য সিক্রেট এজেন্ট

'দ্য সিক্রেট এজেন্ট' মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক সিনেমা। এখানে গুপ্তচর মানেই অ্যাকশন হিরো নয়, বরং এমন একজন মানুষ, যে দিনের পর দিন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে রাখতে নিজেকেই চিনতে ভুলে গেছে।

সিনেমাটি দেখায়, রাষ্ট্র যখন কাউকে 'এজেন্ট' বানায়, তখন সে শুধু তথ্য বহন করে না—সে সন্দেহ, ভয় আর নৈতিক দ্বন্দ্বও বহন করে। গল্পের কেন্দ্রে থাকা চরিত্রটি এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে সে আর নিশ্চিত নয়—সে কাকে রক্ষা করছে, কীসের বিনিময়ে।

এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি এর সংযম। এখানে নাটকীয় সংলাপ নেই, বড় কোনো বক্তৃতা নেই। বরং আছে নীরবতা, অস্বস্তিকর অপেক্ষা আর ধীরে ধীরে জমে ওঠা মানসিক চাপ।

'দ্য সিক্রেট এজেন্ট' মনে করিয়ে দেয়—সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ অনেক সময় মানুষের নিজের ভেতরেই হয়।

২. ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার

এই সিনেমাটি যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মানুষগুলো এখানে 'বীর' নয়, তারা ভাঙা, ক্লান্ত, বিভ্রান্ত।

সিনেমার গল্প এগোয় কয়েকজন সাবেক সৈনিকের জীবনের ভেতর দিয়ে। যুদ্ধ শেষ, কিন্তু তাদের ঘুম শেষ হয় না; দুঃস্বপ্ন শেষ হয় না। সমাজ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু তারা নিজেরাই জানে না—স্বাভাবিক মানে আসলে কী।

এই সিনেমা দেখায়, যুদ্ধ কেবল একটি সময়সীমার ভেতরে আটকে থাকে না। যুদ্ধ মানুষের সম্পর্ক, আত্মপরিচয় আর ভবিষ্যতের বিশ্বাসকে ক্ষতবিক্ষত করে।

'ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার' কোনো দেশ বা রাজনীতিকে সরাসরি দোষারোপ করে না; বরং প্রশ্ন তোলে—এই যুদ্ধগুলোর দাম আসলে কে দেয়?

৩. হ্যামনেট

'হ্যামনেট' একটি শোকের সিনেমা—কিন্তু উচ্চস্বরে নয়। এটি নিঃশব্দ কান্নার গল্প।

শেক্সপিয়ারের পুত্র হ্যামনেটের অকালমৃত্যুকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি আসলে তার স্ত্রী অ্যাগনেসের চোখ দিয়ে শোককে দেখায়।

এখানে মৃত্যু কোনো নাটকীয় ঘটনা নয়; এটি হঠাৎ আসে এবং রেখে যায় শূন্যতা।

সিনেমাটি দেখায়, একজন মা কীভাবে প্রতিদিন একই ঘরে থেকেও আগের জীবনে আর ফিরতে পারে না।

ক্যামেরার ব্যবহার অত্যন্ত সূক্ষ্ম। প্রকৃতি, আলো, বাতাস—সবকিছু যেন শোকের অংশ হয়ে ওঠে।

'হ্যামনেট' প্রমাণ করে, বড় সাহিত্যিক নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিগত কষ্ট কতটা গভীর হতে পারে।

৪. সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু

এই সিনেমাটি আমাদের সম্পর্কের জিনিসগুলোর দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একটি পুরোনো বাড়ি, কিছু স্মৃতি, কিছু অসমাপ্ত কথার মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের গল্প ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু দেখায়, অতীত কখনো শুধুই স্মৃতি নয়—তা বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে।

চরিত্রগুলো নিজেদের মতো করে এগোতে চায়, কিন্তু স্মৃতি বারবার তাদের টেনে ধরে।

এই সিনেমা বিশেষভাবে শক্তিশালী তার সংলাপে। খুব সাধারণ কথার মধ্যেও গভীর ক্ষত লুকিয়ে থাকে।

এটি এমন একটি ছবি, যা আমাদের ভাবায়—আমরা আসলে কী আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি?

৫. মার্টি সুপ্রিম

'মার্টি সুপ্রিম' একজন উচ্চাভিলাষী মানুষের গল্প। শুরুতে সে অনুপ্রেরণার মতো লাগে—দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী, লক্ষ্যনির্দিষ্ট। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরের অন্ধকার বেরিয়ে আসে।

এই সিনেমা দেখায়, ক্ষমতা কীভাবে মানুষের ভেতরের ভালো দিককে চেপে ধরে।

মার্টির উত্থান যেমন আকর্ষণীয়, তার পতন ততটাই অস্বস্তিকর।

সিনেমাটি কোনো নৈতিক উপদেশ দেয় না। বরং দর্শককে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সাফল্যের জন্য আমরা ঠিক কতটা ছাড় দিতে রাজি?

৬. ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট

একটি ছোট দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও সিনেমাটি দ্রুতই বড় হয়ে ওঠে। একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কীভাবে বহু জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়, তা দেখানো হয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে।

এখানে কেউ ইচ্ছাকৃত খলনায়ক নয়। সবাই নিজের অবস্থান থেকে সঠিক মনে করেই কাজ করে। এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি এর মানবিকতা।

'ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট' সিনেমাটি আমাদের শেখায়—জীবনে সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না, আর তার দায় সব সময় কারো একার নয়।

৭. সিনার্স

এই সিনেমাটি অন্ধকারের ভেতর ঢুকে যায়—নৈতিকতার সেই জায়গায়, যেখানে সাদা-কালোর বিভাজন কাজ করে না।

'সিনার্স' দেখায়, মানুষ কেন ভুল করে এবং সেই ভুলের পেছনে কী কী গল্প থাকে।

এখানে পাপ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি বাস্তব পরিস্থিতির ফল।

ভিজ্যুয়াল ও সাউন্ড ডিজাইনের দিক থেকে এটি বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী সিনেমাগুলোর একটি।

দর্শক হিসেবে আপনি অস্বস্তি বোধ করবেন এবং সেটাই এই সিনেমার সাফল্য।

৮. নো আদার চয়েস

এই সিনেমাটি সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

চরিত্রগুলো এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যেগুলো বাইরে থেকে ভুল মনে হতে পারে—কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে বোঝা যায়, তাদের সামনে সত্যিই কোনো বিকল্প ছিল না।

'নো আদার চয়েস' দেখায়, সমাজ কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্তকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। এই সিনেমা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের গল্প খুব সততার সঙ্গে তুলে ধরে।

৯. ট্রেইন ড্রিমস

'ট্রেইন ড্রিমস' একটি নীরব, সংযত সিনেমা—যেখানে সময়ই প্রধান চরিত্র। গল্পের কেন্দ্রে আছে এক সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যে রেললাইন বানায়, বন কেটে পথ তৈরি করে, আর চোখের সামনে আধুনিক আমেরিকার জন্ম দেখে যায়।

সে ইতিহাসের ভেতরে থেকেও ইতিহাসের বাইরে। রাষ্ট্র বদলায়, প্রযুক্তি এগোয়, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন গড়ে ওঠে হারানো, নিঃসঙ্গতা আর স্মৃতির ভার নিয়ে।

এই সিনেমার শক্তি এর মিনিমালিজমে—সংলাপ কম, আবেগ নীরব। প্রকৃতি এখানে শুধু পটভূমি নয়, মানুষের জীবনের নীরব সাক্ষী।

ট্রেইন ড্রিমস একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—ইতিহাসে নাম না থাকলেও কি একটি জীবন অর্থহীন?

১০. সরি, বেবি

এই তালিকার সবচেয়ে স্নিগ্ধ, হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের সিনেমা এটি। ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার আর না বলা 'দুঃখিত'—এই নিয়েই 'সরি, বেবি'।

এটি কোনো আদর্শ প্রেমের গল্প নয়। বরং বাস্তব সম্পর্কের গল্প, যেখানে মানুষ ভুল করে, আঘাত দেয়, আবার ফিরে আসতে চায়।

এই সিনেমার শেষে কোনো বড় সমাধান নেই, শুধু একটি উপলব্ধি আছে—সময় পেরিয়ে গেলে অনেক কথাই আর বলা যায় না। এই সিনেমা দেখার পর মনে হবে—আমরাও তো কাউকে না কাউকে একদিন বলতে চেয়েছিলাম, 'সরি, বেবি'।

Comments

The Daily Star  | English

Bangladesh blocks IPL broadcast after Mustafizur episode

The decision comes in the aftermath of Bangladesh pacer Mustafizur Rahman’s removal from Kolkata Knight Riders squad following directives from BCCI.

1h ago