গ্রিনল্যান্ড পেতে সেনা অভিযানের কথাও ভাবছেন ট্রাম্প?

বক্তব্য রাখছেন ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
বক্তব্য রাখছেন ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

গ্রিনল্যান্ডের দখল পেতে উঠেপড়ে লেগেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার নিজ বয়ান অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে নিরাপদ রাখতে গ্রিনল্যান্ডই 'চাবিকাঠি'। এ দিকে, ডেনমার্ক ও এর স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড আবারও জোর দিয়ে বলেছে যে তাদের 'ভূমি বিক্রির জন্য নয়'।

জন মনে ভীতি আছে—একবার যে জিনিসে ট্রাম্পের নজর পড়ে, তা করায়ত্ত না করা পর্যন্ত তিনি দমেন না। তাই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ পেতে সামরিক অভিযানে যাওয়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেননি এই রিপাবলিকান নেতা।

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

বড়দিনের ছুটিতে পরিবারের কাছে ফিরছেন মার্কিন শিক্ষানবিশ সেনারা। ফাইল ছবি: রয়টার্স
বড়দিনের ছুটিতে পরিবারের কাছে ফিরছেন মার্কিন শিক্ষানবিশ সেনারা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গতকাল হোয়াইট হাউসে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার অন্যান্য বিকল্প উপায় নিয়ে সহযোগীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ট্রাম্প। এগুলোর মধ্যে সেনা অভিযান অন্যতম।

গত শনিবার সামরিক অভিযান চালিয়ে কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করার ব্যবস্থা করেন ট্রাম্প।

ইতোমধ্যে মাদুরোকে মাদকপাচারের অভিযোগে নিউইয়র্কের আদালতেও হাজির করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মত, ভেনেজুয়েলার সফল অভিযানের পর গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।

পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট জানান—রাশিয়া ও চীনের মতো শত্রুদের নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্পের জন্য 'গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান বিষয়'।

এএফপিকে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীরা পররাষ্ট্রনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণে বেশ কয়েক ধরনের বিকল্প খতিয়ে দেখছে। অবশ্যই, কমান্ডার ইন চিফের (ট্রাম্প) নির্দেশে মার্কিন সেনাবাহিনী (মোতায়েন করা) সব সময়ই একটি (গ্রহণযোগ্য) বিকল্প।'

অপরদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চান ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের রুবিও আরও জানান, হুমকি দেওয়া মানেই এটা নয় যে 'সামরিক অভিযান' আসন্ন।

ন্যাটোর ভবিষ্যতে সংশয়

গ্রিনল্যান্ড হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে—বল প্রয়োগ করে তাদের দ্বীপ ছিনিয়ে নেওয়ার যেকোনো উদ্যোগের অর্থ হলো, ন্যাটো জোটের কার্যক্রম ও আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর ৮০ বছরের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কসহ 'সবকিছু' থামিয়ে দেওয়া।

ডেনমার্কের এই দাবিতে সত্যতাও রয়েছে। ন্যাটো জোটের সনদের বহুল আলোচিত পঞ্চম অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এক সদস্য রাষ্ট্র বাইরের কোনো শত্রুর কাছ থেকে হামলার শিকার হলে জোটের বাকি সব সদস্য সেই আক্রান্ত সদস্য রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেবে।

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় ২০০ সেনা মোতায়েন আছে। ফাইল ছবি: এএফপি
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় ২০০ সেনা মোতায়েন আছে। ফাইল ছবি: এএফপি

কিন্তু, এ ক্ষেত্রে এক মিত্র আরেক মিত্রের বিরুদ্ধে সেনা হামলা চালালে কী হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে অভিযান চালালে ন্যাটো জোটের মূলনীতির লঙ্ঘন হবে।

স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মৎজফেল্ট সামাজিকমাধ্যমে জানান, তারা ২০২৫ সালের পুরোটা জুড়ে রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন মত দেন, রুবিওর সঙ্গে বৈঠক হলেও 'কিছু ভুল বোঝাবুঝির' অবসান হবে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড 'বিক্রির জন্য নয়' এবং সার্বভৌম দ্বীপটির ৫৭ হাজার বাসিন্দাই এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

অনেক আগে থেকেই ট্রাম্পের নজর গ্রিনল্যান্ডে

২০১৭ সালে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে তার আগ্রহ আছে।

এ প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করার সময় ট্রাম্প বলেছেন, সেই অঞ্চল 'কৌশলগতভাবে' আকর্ষণীয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে এসে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যু আবারও সামনে আনেন।

গ্রিনল্যান্ডের নেতা ইয়েন্স ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোলাজ ছবি: এএফপি
গ্রিনল্যান্ডের নেতা ইয়েন্স ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোলাজ ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ১৮৬৭ সালে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা অঞ্চল কিনেছিল।

প্রায় ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটারের এই আলাস্কা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও জনবিরল অঙ্গরাজ্য।

'গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাই-ই'—এমন মন্তব্য করে এই ইস্যুটিকে আবার চাঙা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর ২২ ডিসেম্বর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোয় সাংবাদিকদের তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড কতটা 'অত্যাবশ্যক' তা তুলে ধরতেই এমন মন্তব্য করেন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত 'শান্তি' পাবেন না শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প। কূটনীতি না বাহুবল, কোন অস্ত্রের মাধ্যমে তিনি তা অর্জন করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Comments

The Daily Star  | English