বাজার থেকে মিলেনিয়ালরা যেভাবে মাছ কিনবেন
শুরুটা হয়েছিল সেই চেনা অভিযোগ থেকেই। বড়রা বলে থাকেন—মিলেনিয়ালরা নাকি ভালো মাছ চিনতেই পারে না। তবে যদি কোনো তাজা মাছ লাফ দিয়ে ব্যাগে ঢুকে পড়ে সে ভিন্ন আলাপ। কিন্তু এছাড়া তারা নাকি তাজা মাছ কিনতে পারে না। শহরে বড় হওয়া, স্ক্রিনে ডুবে থাকারা নাকি কাঁচা বাজারের পথটাও ঠিকমতো চেনে না!
এসব শুনে এবারে তাজা মাছ কেনার চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নিলাম!
শুরুতে পরিকল্পনার শেষ ছিল না। বেশ একটা পরিকল্পনা করে বসলাম। ভোরের আলো ফোটার আগেই, অর্থাৎ ভোর ৪টায় ঠিক যখন মাছের ট্রাকগুলো আসে তখন কর্ণফুলী বাজার ছুটে যাব। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেটা তো আর হলো না। আমি মিলেনিয়াল, তবে মানুষ তো বটে। তাই শেষ পর্যন্ত নিত্যদিনের সময়েই ঘুম থেকে উঠে দুপুরের দিকে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের পথে রওনা দিলাম।
বাজারে ঢুকতেই মনে হলো যেন এক বিশাল কোলাহলের জগতে পা রাখলাম। চারিদিকের জমজমাট কোলাহলে প্রতিটা বিক্রেতা ব্যস্ত, প্রতিটা দোকান ঠাসা, আর আমার মতো নতুন, দিকভ্রান্ত ক্রেতার জন্য কারও হাতে ঠিক দুই সেকেন্ডের বেশি সময় নেই। বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে লোহা, ঘাম আর মাছের গন্ধ মিলিয়ে কেমন এক ধরনের নোনতা গন্ধ। এত এত মাছ চারিদিকে। রাস্তাগুলো এতটাই ভেজা যে মনে হচ্ছিল, চটি পরে হাঁটা মানেই নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলা।
কয়েকজন বিক্রেতাকে ভালো মাছ আর খারাপ মাছ চিনব কীভাবে—এই প্রশ্ন করতেই কেউ ভদ্রভাবে 'ব্যস্ত আছি' বলে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলো আবার কেউ একেবারে সোজাসাপটা বলে বসলো, 'জানেন না তো আমি কী করবো?'। ঠিকই তো। ঢাকার বাজারে এসে কেউ-ই হাসিমুখে কাস্টমার সার্ভিসের আশা করে না।
কিন্তু তারপরই আমাকে দয়া করে কোথা থেকে উদয় হলেন মুনির ভাই। ১৭ নম্বর দোকানের মালিক মুনির ভাই। সৌভাগ্যবশত তার কয়েক মিনিট পাওয়া গেল। পাশের চায়ের দোকান থেকে দু'চুমুক চা খেতে খেতে তিনি আমাকে মাছ কেনার কায়দা শেখাতে শুরু করলেন।
সেরা সময়
তিনি বললেন, 'সকাল ৯টার দিকে। তখনই সবচেয়ে টাটকা মাছ বাজারে আসে। যত দেরি করবেন, তখন আপনার কপালে জুটবে অন্যের বাতিল করা মাছ। তিনি মাছের ধরনও বুঝিয়ে দিলেন: একদম দামের মাথায় থাকে খাঁটি নদীর মাছ। মাঝারি দামের হলো যেগুলো নদী আর চাষ দুইয়ের মিশ্রণ। আর সবচেয়ে সাশ্রয়ী হলো পুরোপুরি চাষের মাছ। আর প্রিয় ইলিশের ক্ষেত্রে? গলার দিকটা দেখবেন—চওড়া আর শক্ত হলে ভালো, আর চোখ অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে।'
মুনির ভাইয়ের এসব গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ছাড়াও মাছ বাজারে ঘুরে নিজের মতো কিছু জ্ঞান আহরণ করলাম। ঢাকায় মাছ কিনতে গেলে যেগুলো জানা অতি জরুরি,ত তা হচ্ছে—
টাটকা হওয়াই আসল কথা
যদি শুধু জানেন কোথায় খেয়াল করতে হবে, তাহলে মাছ দেখেই কিন্তু বুঝে ফেলতে পারবেন অনেক কিছু। গন্ধই প্রথম সংকেত। ভালো মাছের গন্ধ হবে হালকা ও সতেজ; কোনোভাবেই ভেজা কাপড়ের মতো তীব্র, পচা গন্ধ হবে না। তারপর আসে চোখ—পরিষ্কার, উজ্জ্বল, যেন ক'ঘণ্টা আগেও সাঁতার কাটছিল। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে মাছের গা আবার আগের মতো ফিরে আসবে; নরম বা চটচটে হলে সেটা ফ্রেশ নয়। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো ফুলকা। সেগুলো হওয়া চাই লালচে বা গোলাপি। বাদামি বা নিস্তেজ রঙ মানেই সতর্ক হওয়ার সময়।
আর তারপরই মুনির ভাই যোগ করলেন, 'মাছের নাভির জায়গাটা লক্ষ্য করতে হবে', মাছওয়ালারা এভাবেই বলে থাকে। যদি ওই অংশটা পরিষ্কার থাকে, তবে মাছ টাটকা থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু যদি কালচে হয়ে থাকে, তাহলে বুঝে নেবেন, মাছের অবস্থা খুব একটা সুবিধার না।
মৌসুম আর দামের হিসাব
ঢাকার মাছ, বিশেষ করে ইলিশ, পুরো নিজের নিয়মে চলে। মৌসুমের বাইরে দামে আকাশচুম্বী, আর মাছের মান নিয়েও থাকে সন্দেহ। অনেক সময় যেটা ইলিশ বলে বিক্রি হয়, সেটা ইলিশই নয়। সস্তা মাছকে চালিয়ে দেওয়া হয় 'প্রিমিয়াম' নামে। এমনকি নকল ইলিশ চেনার জন্য গবেষণাও হয়েছে! সুতরাং মাছ কেনার নিয়ম খুব সহজ: সাবধান থাকা। উত্তেজনা যেন বিচারবুদ্ধি নষ্ট না করে। পচা মাছের পেছনে বেশি টাকা খরচ করার চেয়ে কখনো কখনো মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করাই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশ্বাস আর সততা যাচাই
ঢাকার মাছের বাজারে সৃজনশীলতার অভাব নেই। তবে সব সৃজনশীলতা ভালো ধরনের হয় না। যেসব মাছের চাহিদা বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সস্তা মাছ মিশিয়ে দেওয়া বা নিম্নমানের মাছকে 'প্রিমিয়াম' বলে চালিয়ে দেওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। তাই এক্ষেত্রে বাজারের সুনাম যাচাই করা জরুরি। মাছ বাজারে যাওয়ার আগে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে নিন কোন দোকানগুলো বিশ্বাসযোগ্য। আর যে বিক্রেতা আপনাকে তার মাছ কাছ থেকে দেখে নিতে দেয়, প্রশ্ন করতে দেয়, তার কাছেই কেনা সবচেয়ে নিরাপদ।
বাড়িতে সংরক্ষণ ও যত্ন
বাজার থেকে মাছ কিনে বাড়িতে ফিরলেই যুদ্ধ শেষ—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। মাছ খুবই নাজুক জিনিস। পথে ফেরার সময় যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখুন, বিশেষ করে দূরে যেতে হলে বরফ সঙ্গে রাখা সবচেয়ে ভালো। ঢাকার গরমে মাছকে কখনোই বেশি সময় বাইরে রেখে দেবেন না। যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার করে ভুঁড়ি ফেলে নিন। সঙ্গে সঙ্গে রান্না না করলেও সমস্যা নেই। কিন্তু দেরি করলে টাটকা থাকবে না আর। ফ্রিজ আপনার নিরাপত্তার জাল ঠিকই, তবে সময় যত বাড়বে, মাছের মান ততটাই কমতে থাকবে।
অনলাইনে মাছ কেনা
অনলাইনে মাছ কেনা নিয়েও মুনির ভাই তার মতামত জানালেন। 'হ্যাঁ, সুবিধা আছে। পরিষ্কার করে বাসায় পৌঁছে দেয়। কিন্তু তাতে হাতেকলমে মাছ চেনা যায় না।' নিজের স্টলের দিকে ইশারা করে তিনি বললেন, 'এখানে দেখে, গন্ধ নিয়ে, হাতে স্পর্শ করে মাছ চেনা যায়। আর অনলাইনে শুধু বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কেনাকাটা হয়।'
তিনি ভুল বলেননি। অ্যাপ খুলে সোফায় বসে অর্ডার করাটা বেশ আরামের এটা মানতেই হবে। কিন্তু বাজার থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে, বাজারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে, দরদাম করে, ভালো মাছ বেছে নেওয়া কখনোই কোনো অ্যাপ শেখাতে পারবে না।
টাউন হল বাজার থেকে নিজের কেনা মাছ হাতে নিয়ে বের হওয়ার সময় এক অদ্ভুত সাফল্যের অনুভূতি হয়েছিল। চেকলিস্ট ধরে মাছ বেছে নিলাম, একটু দরাদরি করলাম। মনে হলো ঠকছি। কিন্তু শিখলাম অনেক কিছু, আর কাঁদার মধ্যে পা পিছলে পড়েও যাইনি।
কোনো পথচারীর কাছে এটি খুব সাধারণ বাজার করা মনে হতে পারে। আমার বাবা আর দাদারা এই দায়িত্ব পালন করেছেন বছরের পর বছর। মনে হলো, ছোট্ট কিছু দক্ষতাও মানুষকে তার বেড়ে ওঠা সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে বেঁধে রাখতে পারে।
ছবি: মো. আশিকুল আলম (শুভ)
অনুবাদ করেছেন সৈয়দা সুবাহ আলম


Comments