জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের আসন সমঝোতায় জটিল জট
ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট 'এক বাক্সে' আনার লক্ষ্যে দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা আলোচনার পরও আসন ভাগাভাগির জট খুলতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। উল্টো দুই দলই ২৪০টির বেশি আসনে প্রার্থী দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনের ঠিক আগমুহূর্তে আসন সমঝোতার আলোচনা থমকে যায়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শেষ দিনে জামায়াত ২৭৬টি এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারা দেশে অন্তত ২৪০টি আসনে এই দুই দলের প্রার্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন। এর মধ্যে অনেক আসনেই দুই দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা লড়ছেন।
সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। সেখানে ৪৯টি আসনে দুই দলেরই প্রার্থী রয়েছে। এরপর ঢাকায় ৪০টি, খুলনায় ৩৪টি, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে ৩৩টি করে এবং রংপুরে ৩০টি আসনে দুই দল মুখোমুখি অবস্থানে। বরিশালে ১৭টি এবং সিলেটে ৮টি আসনেও দুই দল থেকেই প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনের আগের দিন জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) আরও দুটি দলকে যুক্ত করে ১১ দলীয় জোট ঘোষণা করা হয়। এনসিপির অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের ৩০টি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও একই অবস্থান নিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমদ স্বীকার করেছেন যে জোটে টানাপোড়েন চলছে। তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তের কিছু সিদ্ধান্তে একাধিক দল ক্ষুব্ধ হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, নতুন দলগুলোকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের আসন দেওয়ার বিষয়ে পুরোনো শরিকদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। তিনি বলেন, শুধু ইসলামী আন্দোলন নয়, অন্য দলগুলোও এতে অসন্তুষ্ট।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জোটের ফাটল এখনো জোড়া লাগানোর পর্যায়ে আছে। এখনো সবাই একসঙ্গে চলার পক্ষে। আশা করছি, এই মানসিকতার পরিবর্তন হবে না।
শিগগিরই জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের অবশ্য সংকটের কথা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং শিগগিরই সমঝোতা চূড়ান্ত হবে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সংকটের খবর সত্য নয়।
দুই দলের শীর্ষ নেতারা যেসব আসনে প্রার্থী হয়েছেন, সেখানে ফাটল সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কুমিল্লা-১১ আসনে জামায়াতের তাহেরের বিরুদ্ধে লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের মো. মহিউদ্দিন। রংপুর-২ আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের আশরাফ আলী।
খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিরুদ্ধে লড়ছেন খেলাফত মজলিসের মো. আব্দুল কাইউম জমাদ্দার। ইসলামী আন্দোলনের শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে সেখানে।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে।
কক্সবাজার-২ আসনে জোটের মধ্যেই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে জামায়াতের সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ (মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন), ইসলামী আন্দোলনের জিয়াউল হক এবং খেলাফত মজলিসের ওবায়দুল কাদের নদভী প্রার্থী হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের শরিফুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
খুলনা-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুছ আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের মো. কবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
বরিশাল-৫ ও ৬ আসনে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী যথাক্রমে মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও মো. মাহমুদুন্নবী।
ইসলামী আন্দোলনের নেতা সৈয়দ এছহাক মো. আবুল খায়ের এবং সৈয়দ মো. মোসাদ্দেক বিল্লাহ যথাক্রমে বরিশাল-৪ ও ঢাকা-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যেখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ও সৈয়দ জয়নুল আবেদীন।
তবে ঐক্যের কিছু নজিরও আছে। ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে জোটের কোনো শরিক প্রার্থী দেয়নি।
টানাপোড়েন থাকলেও জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের এই জোটকে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় চার দশক পর এই প্রথম দুই দল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী জোটে এসেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে নিষিদ্ধ হয়েছিল জামায়াত। নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর জামায়াত ১৯৮৬ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১৯৯১ সালে ১৮টি আসন পেয়ে তাদের সেরা ফল করে। ওই নির্বাচনে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল দলটি।
জামায়াত ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিল। ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে দলটির নিবন্ধন বাতিল হলেও ২০২৫ সালের জুনে তারা প্রতীকসহ নিবন্ধন ফিরে পায়।
অন্যদিকে ১৯৮৭ সালে চরমোনাইর পীরের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে নাম পরিবর্তন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি ১১ হাজার ১৫৯ ভোট পেয়েছিল। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা ১২ লাখের বেশি ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দল হিসেবে উঠে আসে। যদিও ওই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার ব্যাপক অভিযোগ ছিল। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচন বর্জন করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থী দলগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাদের ঐক্যের প্রচেষ্টা নতুন মাত্রা ও গুরুত্ব পেয়েছে।

Comments