মুশফিকের রঙচটা ক্যাপ

Mushfiqur Rahim

রঙ চটে গেছে বহু আগেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের লোগোটাও হয়ে গেছে আবছা। বিবর্ণ হয়ে পড়া টেস্ট ক্যাপটা ব্যাটের হাতলে রেখে ছবি উঠিয়ে মুশফিকুর রহিম লিখেছেন, 'সকল উত্থান-পতনের সঙ্গী…'। মঙ্গলবার থেকে সিলেটে ক্যারিয়ারের ৯৯তম টেস্ট খেলতে নামবেন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। সব কিছু ঠিক থাকলে ১৯ নভেম্বর মিরপুরে ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে শততম টেস্ট খেলতে নামবেন তিনি।

২০০৫ সালের ২৬ মে, ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে তখনকার অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের কাছ থেকে টেস্ট ক্যাপটা মাথায় চাপিয়েছিলেন মুশফিক। এরপর আদতেই এই ক্যাপটা ছিলো তার সব উত্থান-পতনের সঙ্গী। যত্নে আগলে রেখেছেন দীর্ঘ দুই দশক, সবগুলো টেস্টে এই ক্যাপ পরেই খেলেছেন তিনি।

দুনিয়ার নানান প্রান্তে ঘুরে খেলেছেন টেস্ট, কখনো দ্যুতি ছড়িয়েছেন ব্যাটে, কখনো ব্যর্থতায় ডুবেছেন। ২০ বছরের ধুলো জমা হতে হতে স্বাভাবিকভাবেই রঙ হারিয়েছে তার ক্যাপ। তবে রঙ হারালেও বেড়েছে ইতিহাসের দাবি।

প্রথম টেস্ট ক্যাপটা এমন যত্নে আগলে রাখার ঘটনা টেস্ট ক্রিকেটে অবশ্য অহরহ, বরং এটা আজকাল টেস্টের ঐতিহ্যের অংশ। যেসব ক্রিকেটাররা টেস্ট ক্রিকেটকে মর্যাদায় রাখেন উঁচুতে তাদের কাছে তো এটা আবেগের জায়গা। শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি ব্যাটার কুমার সাঙ্গাকারা তার রঙ চটা ক্যাপ নিয়ে একবার বলেছিলেন, 'নতুন ক্যাপ কিনে নেওয়া যায়, কিন্তু পুরোনোটার ইতিহাস কেনা যায় না।'

ভারতের রাহুল দ্রাবিড় বলতেন, 'এই ক্যাপের প্রতিটি দাগ, প্রতিটি ঘাম আমার সংগ্রামের স্মৃতি।' মুশফিকের এমনটা ভাবা স্বাভাবিক। ২০০৫ সালে তিনি যখন টেস্ট ক্যাপ পান তখন কেবলই কৈশোরকাল পেরিয়েছেন। চেহারায় তখনো বালকসুলভ আভা। তখন হয়ত কেউই ভাবেননি এই ছেলেটি একদিন দেশের হয়ে খেলবেন শততম টেস্ট।

বাংলাদেশের কেউ একশোটা টেস্ট খেলবেন এই ভাবনাও আসলে বাড়াবাড়ি ছিলো তখনকার সময়। এমনকি মুশফিকের পর আর কে একশোটা টেস্ট খেলবেন দেশের হয়ে তা আজও বড় কঠিন প্রশ্ন। মুমিনুল হকের হয়ত সুযোগ আছে, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।

মুশফিকের টেস্ট ক্যাপটার তাই ঐতিহাসিক মূল্য ইতোমধ্যেই দেশের ক্রিকেটে বিপুল। বাংলাদেশের টেস্টের গল্পটাও যে এই ক্যাপের ভাঁজে লেখা আছে।

টেস্ট ক্যাপের মূল্যটা সবচেয়ে বেশি দেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা। তাদের টেস্ট ক্যাপটা ডাকা হয় 'ব্যাগি গ্রিন' নামে। ক্যারিয়ারের ১৬৮ টেস্টের সবগুলোতেই সেই ব্যাগি গ্রিন সঙ্গী ছিলো স্টিভ ওয়াহর। কিংবদন্তি অজি অধিনায়ক বলেছিলেন, 'এই ক্যাপটা কেবল আমার নয়, আমার আগে যারা খেলেছেন, তাদেরও উত্তরাধিকার বয়ে আনে।'

আরেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিং তার প্রিয় ব্যাগি গ্রিন টেস্ট ক্যাপ একবার হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই ঘটনায়  তিনি যেন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ চলাকালে বিমানবন্দরে লাগের ট্রান্সফারের সময় খোয়া যায় পন্টিংয়ের ব্যাগি গ্রিন। হতবিহবল হয়ে পড়া পন্টিং বলেছিলেন, 'ওটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। ওটা হারানো মানে আমার আত্মার এক অংশ হারানো।'

মুশফিক এসব আবেগের মূল্য বুঝেন টেস্টের প্রতি তার নিবেদন দিয়েই। মুখে টেস্টের গুনগান গাইলেও টি-টোয়েন্টির রমরমা যুগে বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটার যখন দীর্ঘ পরিসরের আবেদন বুঝতে অক্ষম। মুশফিকের ক্যাপ তখন তাদের সামনে হতে পারে এক প্রেরণা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ফরম্যাটের প্রতি নিজেদের নিংড়ে দেওয়ার তাড়না তারা চাইলে পেতেই পারেন। একটা টেস্ট ম্যাচের সাফল্য একজন ক্রিকেটারকে যে উচ্চতায় তুলে অন্য কোন কিছুই তো তা পারে না। প্রথমবার আইপিএল জিতে তাই বিরাট কোহলি বলেন, 'আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্তগুলোর মধ্যে এই মুহূর্তটি অন্যতম, তবে এটি এখনও টেস্ট ক্রিকেটের থেকে ৫ ধাপ নিচে, আমি টেস্ট ক্রিকেটকে এতটাই ভালোবাসি এবং টেস্ট ক্রিকেটকে এতটাই মূল্য দিই।'

Comments

The Daily Star  | English

Trump says US oil firms to head into Venezuela

US companies to invest heavily in Venezuela’s oil sector, Trump says

2h ago