দিনাজপুরে কেমন কেটেছে খালেদা জিয়ার শৈশব, এলাকাবাসীর স্মৃতিচারণ

দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ি এলাকায় বাবার তৈরি করা এই বাড়িতেই শৈশব কেটেছে খালেদা জিয়ার। ছবি: স্টার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত দিনাজপুরের মানুষ। শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই শহরে। এলাকাবাসী ও বিশিষ্টজনেরা তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিচারণা করছেন।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের আগে খালেদা জিয়ার ছোটবেলাটা কেটেছে দিনাজপুরে। তিনি শহরের সেন্ট যোসেফ স্কুল (মিশনারি স্কুল নামে পরিচিত) থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন।

দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা ইয়াসমিন জানান, মিশনারি স্কুলের পর খালেদা জিয়া এই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেন।

খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদার। দেশভাগের পর ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে সপরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন ইস্কান্দার মজুমদার। জলপাইগুড়িতে তিনি চা–ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইস্কান্দার মজুমদার তার পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী এলাকায় 'তৈয়বা ভিলা'য় বাস করতেন এবং এখানেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি ১৯৭৫ সালে জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।

খালেদা জিয়ার মা তৈয়বা মজুমদার আমৃত্যু ওই বাড়িতেই বসবাস করেছেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গতকাল সকালে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শহরের জেল রোড এলাকার দলীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন। শহরজুড়ে চলছে তার স্মৃতিচারণা। দলীয় কার্যালয় এবং বালুবাড়ী এলাকায় তার পৈতৃক বাড়িতে কোরআন খতমের আয়োজন করা হয়েছে।

দিনাজপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী শামীম বিন গোলাপ পাল (৬৫) স্মৃতিচারণা করে বলেন, 'আমার মা প্রয়াত দৌলতুন রহমান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, যখন বেগম জিয়া সেখানে পড়তেন। তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। মায়ের কাছে শুনেছি, স্কুলজীবনে তিনি খুব প্রাণবন্ত ও বন্ধুসুলভ ছিলেন। সবার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল এবং বড়দের খুব শ্রদ্ধা করতেন।'

তিনি একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন আমার মা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। মা একটা কাজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন। খালেদা জিয়াকে তার যাওয়ার কথা জানালে তিনি তৎক্ষণাৎ মাকে তার অফিসে নিয়ে যেতে বলেন। মা দপ্তরে ঢুকতেই খালেদা জিয়া চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার শিক্ষককে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তার এই বিনয় মাকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছিল। ২০১১ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মা এই গল্পটি খুব আগ্রহ নিয়ে সবাইকে শোনাতেন।'

দিনাজপুরে বসবাসরত খালেদা জিয়ার খালাতো ভাই আবু তাহের (৫৫) বোনের মৃত্যুর খবর পেয়েই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। মুঠোফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'তিনি আত্মীয়স্বজনের প্রতি খুব স্নেহপরায়ণ ছিলেন। যখনই বাড়িতে আসতেন, সবার কথা মন দিয়ে শুনতেন। মায়ের কাছে শুনেছি, স্কুলজীবনে তিনি নাচ ও গানে পারদর্শী ছিলেন। আজ সেসব শুধুই স্মৃতি।'

প্রতিবেশী শওকতউল্লাহ বাদশাহ (৫৫) বলেন, 'আমাদের জন্মের আগেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, তাই তার এখানে থাকার সময়টা সেভাবে মনে নেই। তবে বড়দের কাছে শুনেছি, তিনি খুব মিশুক, বন্ধুসুলভ ও উদার ছিলেন। যখন তিনি দিনাজপুরে আসতেন, তখন দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও ভিড় করতেন। তিনি সবার কথা শুনতেন।'

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্দেশে দিনাজপুর-৩ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, '৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে নেত্রীর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তিনি সব সময় আমার পরিবারের খোঁজ নিতেন এবং আমাকে স্নেহ করে "পাগলা" বলে ডাকতেন।'

২০১১ সালে প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, 'তিনি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "পাগলা, কেমন আছিস?" এরপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, সব সময় জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবি, এটাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। আজ আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম।'

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে এক জনসভায় ভাষণ দেন। এর আগে ২০০৬ সালের ১৪ জুন বড় বোন সাবেক মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের মৃত্যুর পর তিনি দিনাজপুরে যান।

Comments

The Daily Star  | English

Hasina can’t evade responsibility for Khaleda Zia’s death: Nazrul

In 2018, Khaleda walked into jail, but came out seriously ill, he says

10h ago